• ঢাকা
  • রবিবার, ০৯ মে ২০২১ | ২৫ বৈশাখ, ১৪২৮
সাক্ষাৎকার

যতটুকু সাহস; ততটুকুই শিল্প, ততটুকুই কবিতা: কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন

যতটুকু সাহস; ততটুকুই শিল্প, ততটুকুই কবিতা: কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক:

রেজাউদ্দিন স্টালিন বাংলাদেশের এবং এর বাইরেও একজন সুপরিচিত কবি । তিনি ১৯৬২ সালের ২২ নভেম্বর বাংলাদেশের যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। যশোর এম,এম কলেজ থেকেঅর্থনীতিতে অনার্স ডিগ্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করেন।। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক হিসেবে তিনি ৩৫ বছরের জন্য নিযুক্ত ছিলেন। স্ট্যালিনের কবিতা বিশ্বের বেশিরভাগ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে এবং তিনি বাংলাদেশের টিভি অ্যাঙ্কর এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্বও। স্ট্যালিন পারফর্মিং আর্ট সেন্টার অ্যান্ডিসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান । এছাড়াও তিনি ম্যাজিক লন্ঠনের সিনিয়র সম্পাদক -যা একটি সাহিত্য সংগঠন। রেজাউদ্দিন স্টালিনের মোট বইয়ের সংখ্যা এখন ১০০ এরও বেশি এবং পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা পুরস্কার। এককথায় বলা যায় বাংলা কবিতার বৈশ্বিক কন্ঠস্বর কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। সম্প্রতি নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন  দৈনিক লাখোকন্ঠের সহকারী সম্পাদক ফারুক মোহাম্মদ ওমর।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: করোনার এই মূহুর্তে বইমেলা হওয়া না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আপনার মতামত জানতে চাই?

রেজাউদ্দিন স্টালিন: ধন্যবাদ। আমাদের সামনেই ভাষা আন্দেলনের সেই মহান মাস অমর একুশে ফেব্রুয়ারী। ফেব্রুয়ারির বইমেলা এবার হবে কি হবে না সেই প্রশ্নে যারা সুধীজন, যারা জ্ঞান অন্বেষণী মানুষ তারা কৌতুহল দেখাচ্ছে। অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন যে বই মেলা হবে কি হবে না? কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করি আমাদের বই মেলাটি হবে। বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কতৃপক্ষ নিশ্চই ভাববেন। কেননা অনেকেই কিন্তু বাজারে যাচ্ছেন, বিভিন্ন শপিং মলে যাচ্ছেন। সকল জায়গায় কিন্ত মানুষ যাচ্ছেন একটা বিধি-বিধান পালন করে। মাস্ক পড়ছেন, স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন। এই সব করে যেহুতু তারা অন্যান্য জায়গায় যেতে পারছেন; বইমেলায় কেন পারবে না। একটা প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে যে শীতকাল চলছে । আমি বলবো ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শীত চলে যাবে । যদি আমরা সেই সময় বই মেলা শুরু করি। তাহলে তা মার্চ মাস পর্যন্ত যাবে। এবং আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি সেটিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং আমি মনে করি এই প্রাণের মেলাটি যদি এভাবে হয় আমাদের জন্য ভালো হবে এবং আমাদেরকে আনন্দিত করবে। জ্ঞান-অন্বেষী মানুষ যারা পাঠক তারা কিন্তু এই বই মেলার সাথে যুক্ত হতে চায়। যে কোন ভাবেই হোক বইমেলা হওয়া দরকার। যদি আরও  খারাপ সময় আসে তখন ভার্চুয়াল মেলা হবে। ভার্চুয়াল মেলা সারা পৃথিবীতেই হচ্ছে। আমরা  মনে করি বইমেলা আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির নির্মল শিল্পায়নে একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। সেই জায়গাটিকে সম্মান জানানোর জন্যে আমাদের এই বইমেলাটি করা দরকার।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: বইমেলার লেখক, পাঠক, প্রকাশক এবং বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় অনুবাদেও বিষয়ে কিছু বলবেন।

 রেজাউদ্দিন স্টালিন: প্রতিবছরই বইমেলাতে সব কবি-সাহিত্যিকের বই বের হয়। তাতে দেখা যায় কবিতার বই বেশি। প্রায় তিন-চারশ কবিতার বই বের হয়। কিন্তু বইমেলায় একটা বিষয় আমরা সবসময় দেখি ;ত হলো ক্রেতারা শুধু শিশু কিশোর আর উপন্যাস কেনেন। দু’একটি প্রবন্ধের বই। কবিতার বই বিক্রি হয় খুব কম। এমনকি যারা অনেক বড় নামকরা কবি তাদের বইও কম বিক্রি হয়। এখানে কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। কবিতায় মূলত গণমানুষকে ধারন করতে হয়। তাঁদের মুখের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা যদি আমরা না বুঝি তাহলে কিন্তু আমাদের লেখা গণমানুষের কাছে পৌছাবে না। একদম তাঁদের মুখের ভাষায় যদি আমরা কথা বলতে না পারি। কবিতা লিখতে না পারি, আমাদের সাহিত্যকে যদি মানুষের চাওয়া-পাওয়ায় শামিল করতে না পারি তাহলে মানুষ কেন পড়বে। একবার আমি একজন লেখক কে জিজ্ঞেস করেছিলাম-আপনি কেন লিখেন? তিনি বললেন-আমি আমার আনন্দের জন্য লিখি। আমি কিন্তু এটা বিশ্বাস করি না। আমি যেমন আমার আনন্দের জন্য লিখি তেমনিভাবে একজন পাঠকের আনন্দকেও বিবেচনায় রাখি। আমার লেখা পড়ে যদি পাঠক আনন্দ না পায় তবে এই লেখার মূল্য কি? স্টিভেনশন বলেছিলেন যে- একজন লেখকের লেখা একজন পাঠককে যতট ভালো লাগাতে পারবে, পাঠক যতো প্রীত হবে সেটি হচ্ছে মূল কথা বাকী সব নিরর্থক।অথ্যাৎ যদি পাঠকের ভালো না লাগে, পাঠক যদি সেই বইটি না পড়ে তাহলে কোন কিছুরই মূল্য নেই। সুতরাং আমি মনে করি যে, আমাদের পাঠক কে যেমন ভালো লাগাতে হবে তেমনি এর শিল্পমান বজায় রাখার দিকে সুদৃষ্টি দিতে হবে। পাশাপাশি বইমেলা করার সাথে সাথে বই যাতে পাঠকের কাছে পৌছায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পাঠক যেন আমাদের বই কিনে এবং পাঠ করে তবেই আমাদের সার্থকতা। যদি তা না করে তাহলে আমাদের একবার হলেও আত্ম মূল্যায়ণ করতে হবে কেন পাঠক বই পড়ছে না। আরেকটা বিষয়, বইমেলাতে প্রতি বছর অসংখ্য বই আসে সম্পাদিত । যার অধিকাংশ ভুল বানানে ভরা, এইসব বই পড়ে আমাদের তরুন প্রজন্ম কিছুই শিখবে না বলে আমি মনে করি। সুতরাং প্রকাশক, লেখক সবাইকেই একটা জিনিস বিবেচনায় রাখতে হবে যে ভুল বানানে ভরা বই যেন প্রকাশ না পায়। তাড়াহুড়ো যেন বই না প্রকাশ পায়। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাচ্ছি। এরকম একটা দেশের প্রকাশনা হবে আধুনিক এবং আর্ন্তজাতিক মানের। যা আমাদের এখানে হচ্ছে না। আমরা দেখি যে কিছু মফস্বলীয় গন্ধ নিয়ে লেখকরা কবিরা নিজস্ব টাকায় বই বের করছেন । এটা তরুণ লেখকরা করেন নিজের পরিচিতি হোক কিম্বা খ্যাতির জন্যে। প্রকাশকরাও সেই সুযোগে থাকেন। এটা দূভার্গের বিষয়, এ ধরনের কাজ যেন না করা হয়। আমি আহ্বান করবো প্রকাশকদের।

পৃথিবীর সব দেশেই নিজে নিজেই বই বের করার রেওয়াজ চালু আছে। লেখকরা যতো ভালোবেসে একটি বইয়ের পিছনে আর্থিক, মানসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সময় ব্যয় করেন তার বিনিময়ে প্রকাশকরা সেই বইটি যত্ন নিয়ে করেন না । অনেক সময় দেখা যায় বই ছাপানোর পর বই দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘরে সংগ্রহে রাখার মতো অবস্থায় থাকে না। এটা একটা দিক । আরেকটা দিক হচ্ছে কবিতার আগে যে পাঠক ছিলো; আমি বলবো যে পঞ্চাশ, ষাট সত্তর, আশির দশক পর্যন্ত যে পাঠক ছিলো সে পাঠক কিন্ত কমে গেছে। অনেকে বলছেন যে মিডিয়ার কারণে, মানুষ দেখতে চায় শুনতে চায় শুধু পড়তে চায় না। পরিশ্রম করতে চায় না। তবে আমি বলবো কিছু মানুষ এখনও আছেন বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে চায়। সেই মানুষগুলোর কথা কিন্তু আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের বই মেলার যে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা হলো বাংলা ভাষার আর্ন্তজাতিকায়ন, ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করা, বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি অর্জন করা । আর এ কাজটি করতে হলে আমাদের তরুন প্রজন্মের নতুন লেখকদের বই নির্ভুল ভাবে প্রকাশ করতে হবে। বই যেন তাঁর প্রকৃত বাজার পায়। সে ব্যবস্থাটি আমমাদের মনে রাখতে হবে। আমরা দেখি আমাদের প্রকাশকরা বই বের করে বসে থাকেন কবে সরকার তাদের বই কিনবেন। একানে সরকারের বই কেনার আশায় বসে থাকলে কি হব্?ে আমাদের বিপণন ব্যবস্থা কে সুন্দর করতে হবে। মানুষ যেন ঘরে ঘরে বই পায়। প্রত্যেকটি মফস্বলে, পাড়ায়,পাড়ায় যেন বই পাওয়া যায়, শুধু টেক্সট বই না, নোটবুক না, লাইব্রেরিগুলোতে যেন সাহিত্যের বইও থাকে। সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সময় এসেছে এই বিষয় নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করার। ইদানিং একটা প্রথা চালু হয়েছে যে, প্রকাশক বই বের করবেন তার মধ্য থেকে লেখককে একশ বই কিনতে হবে। এটা একটা বিড়াম্বনা। আরেকটা বিষয় ; লেখকরা কিন্তু সবসময় তাঁর পারিশ্রমিক পাননা। সব মিলিয়ে আমাদের প্রকাশক, লেখকদের অবস্থা কিন্তু বেশি একটা ভালো না। যদি আমরা উন্নত দেশগুলোর কথা বিবেচনা করি সেখানে যারা মোটামুটি ভালো লেখেন তাদের কিন্তু আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। তাঁদের বই প্রকাশ হলে পাঠকের কাছে পৌছানোর দায়িত্ব নেয় প্রকাশকরাই এবং লেখকের সেখানে একশ কপি বই কিনতেও হয় না। উল্টো তাঁদেরকে অনেক সম্মানি দেয়া হয়। যা দিয়ে তাঁরা জীবন ধারন করতে পারেন এবং লেখালেখির জন্য নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। সেই জায়গায় আমরা কবে পৌছাবো জাানি না। আমাদের বইমেলায় পাঁচশ স্টল হয়, পাঁচশজন প্রকাশক। আমাদের একটা বড় বাজার গড়ে উঠেছে কিন্তু তা শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক। এই যে আমাদের বিশ কোটি মানুষ দেশ ও দেশের বাইরে তাদের হাতে বই পৌছানোর কোন ব্যবস্থা কি আমরা গ্রহণ করেছি। ইদানিং অনলাইনে অনেকে বই কিনছেন, ঘরে বসে বই কেনার রেওয়াজও চালু হয়েছে। এই পদ্ধতিতে আমরা আরও বেশি আধুনিকায়ন করতে পারি। আমাদের একুশের যে মূল উদ্দ্যেশ্য তাৎপর্য সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু করা,বাংলার আধুনিকায়ন করা, গণমানুষের কাছে বাংলাকে পৌছে দেয়া। সেটি কিন্তু এখনও সম্ভব হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আমরা পাঁচ-ছয় রকমের শিক্ষা চালু রেখেছি। শুধুমাত্র মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যেই কয়েক রকমের শিক্ষা চালু আছে। কিন্ডার গার্ডেনে প্রত্যেকে নিজস্ব শিক্ষা কায়েম রেখেছেন। আমাদের বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ে নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা, আছে সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থা। সব কিছুর মধ্যে কিন্ত সমন্বয় নেই। একটা পাঁচমেশালি শিক্ষায় আমাদের আগামী তারুণ্য বেড়ে উঠছে। যা দিকে বিশেষ নজর দাবী করছি সংশ্লিষ্ট মহলের। সেই সাথে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কে ঢেলে সাজাতে হবে । আমাদের বইমেলা এবং এর বিপনন কে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। আমাদের লেখক এবং পাঠকরা যেন জীবিকা অর্জনের সঠিক পথ বেছে নিতে পারে তাঁর প্রতিও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এই করোনাকালে পৃথিবীর অনেক দেশের কবিদের সাথে আমার যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে তারা বলেছে বাংলাদেশটা কোথায় ? অথ্যাৎ আমরা স্বাধীনতা পঞ্চাশ বছরে আমাদের দেশটাকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে পরিচয় করাতে পারিনি। তার বলে এটা কি ইন্ডিয়ার মধ্যে, তখন আমাকে বলতে হয়; না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তারে সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা আসে । আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট। সুতরাং আমাদের দূতাবাসগুলোকেও বাংলাভাষা নিয়ে কাজ করা দরকার বলে আমি মনে করি। যদি একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান করে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আমাদের সংযুক্ত করে তাহলে আমাদের ভাষার জন্য যে আন্দেলন তা কিন্তু সার্থক হবে। আরেকটি কথা বলতে চাই। আমাদের ভাষার কোন অনুবাদ হচ্ছে না। আমাদের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোর অনুবাদ হওয়া জরুরী। আর আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনিস্টিটিউটের কাজ কিন্তু এটিই। আমি জানি না সেখান থেকে আমাদের লেখাগুলো প্রকাশ হয়েছে কিনা। অনুবাদের জন্য আলাদা কোন সেল তৈরি হয়েছে কিনা। এটি বাংলা একাডেমিরও কাজ। নজরুল ইনিস্টিটিউটেরও কাজ, শিল্পকলা একাডেমিরও কাজ। প্রত্যেকে তাঁর নিজ নিজ জায়গা থেকে শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিদেশে পাঠাবেন; এটাই কামনা করি । তাহলেই কিন্তু বিদেশে আমাদের ভাষাকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারবো। আর সেটা যদি না করি তবে আমাদের ভাষার জন্য যে আত্মদান তা কিন্তু বিফল হয়ে যাবে। একটাই অনুরোধ আসুন আমরা সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু করি। শুদ্ধ বাংলা বলতে এবং লিখতে চেষ্টা করি। এক জায়গায় দাড়িয়ে যেন আমরা বাংলা প্রমিতকে উপস্থাপন করতে পারি। আজকাল ব্যাংলিশ ভাষার দৌরাত্ম দেখছি যা কাম্য নয়। এই অপসংস্কৃতিকে রুখে দিতে হবে। আমাদের পত্রিকার যে সাহিত্য পাতা হয় । সে গুলোর দিকে সংশ্লিষ্ট মহলকে সুদৃষ্টি  দিতে হবে। তা যেন সততার সঙ্গে হয়। আমরা লক্ষ্য করি ইদানিং অনেক সাহিত্য সম্পাদক আছেন যারা সাহিত্য সম্পর্কে সঠিক ধারনা নেই অথচ সাহিত্য সম্পাদনা করেন এবং তারা লেখকদের কাছ থেকে কিছু উপটৌকন আশা করেন। সেটি না দিলে লেখা ছাপা হয় না। এমনকি বড় লেখকদের এই বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়। আমি পত্রিকার কতৃপক্ষকে অনুরোধ করবো যে সৎ এবং যোগ্য সাহিত্য সম্পাদক দিয়ে সাহিত্য পাতা বের করুন। এই সবগুলো আমাদের বাংলা ভাষার ব্যপকতার জন্য গতিরোধক। আমাদের তা মাড়িয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নির্মল বাংলা ভাষা রেখে যেতে হবে।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: বাংলা ভাষা চর্চায় বরেণ্য কবিদের নিয়ে কিছু বলবেন? যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, আহসান হাবীব।

রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমরা যে ভাষায় কথা বলছি তাঁর পূর্বসুরী কারা এবং এই ভাষায় কারা কথা বলবেন। তা জানতে হবে। আমাদের পূর্বপুরুষগণ বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। সেই চর্যার কাল থেকে মধ্যযুগ, আধুনিক সময়, এখন উত্তর আধুনিক সময়। আমরা যদি আত্ম বিশ্লেষণ করি তাহলে যাদেরকে পাবো শুরুতেই বলতে হয় চর্যাপদের কবিদের কথা। হরপ্পা,লুইপা প্রমুখ তারপরে ঈশ্বর গুপ্ত, আব্দুল হাকিমদের কথা । ঈশ্বর গুপ্ত যখন বললেন-‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। কিম্বা আব্দুল হাকিম যখন বললেন- ‘যেসব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী, সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি’। পরবর্তীকালে মাইকেল যখন বললেন- ‘জন্মভূমি -রক্ষা হেতু কে ডরে মরিতে- যে ডরে, ভিরু সে মূঢ়; শত ধিক তারে। অথবা হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন; তা সবে (অবোধ আমি) অবহেলা করি, পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ’। এই যে কথা আমরা শুনি  তারই ধারাবাহিকতায় আমরা পাই রবীন্দ্রনাথকে । তিনি বলেন-‘যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে, যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে, দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা--তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা’। রবীন্দ্রনাথে যে বাণীটি আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে ; যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে’। একজন সিদ্ধ মানুষ, একজন প্রতিভাবান মানুষ। তাঁকে অনেক সময় একা যেতে হয়। সক্রেটিস কিন্ত একা গিয়েছিলেন। যদিও তাঁকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত সত্য আমরা জানলাম তিনি সত্য পথে ছিলেন। সে রকম ভাবেই অনেক কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের একা পথ চলতে হয়। দৃশ্যত একা কিন্তু একা নন। তাঁর সৃষ্টি কোন না কোন সময় পাঠকের অন্তর জয় করে। যেমনিভাবে পাঠকের হৃদয় জয় করেছিলো আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তিনি দশম শ্রেণীতে উঠে আর লেখাপড়া করতে পারেননি। তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দেলনে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন লেখনিতে এবং ময়দানে। তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিলো । এমনকি তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ হয়েছিলো। একথা এখানে বলা যায় পৃথিবীর আর কোন কবির এতো বই নিষিদ্ধ হয়নি। বৃটিশরা নজরুলের বিরুদ্ধে প্রায় বারটি ফাইল খুলেছিলো। রবীন্দনাথের সেখানে একটি। জালিওয়ান বাঘ হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে তিনি যখন নাইটি পদক পরিত্যাগ করেন সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে একটি ফাইল খোলা হয়। নজরুলের বিরুদ্ধে বৃটিশদের ফাইলে বলা হয়েছিলো বাংলার তরুণদের সংঘঠিত করে বিদ্রোহ করছে; গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টও ছিলো এ রকম। আমরা জানি যে নজরুলের সবচেয়ে বড়  যে কাজ আমাদের সামনে প্রতিফলিত হয়েছে তা হলো একটি অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষ তৈরি করা। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি স্বাধীন বাঙালী আবাসভূমি। এজন্য তিনি লিখেছিলেন-নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম, চির মনোরম চির মধুর। এ কতিাটির মধ্যে আমরা বাংলাদেশের রূপ পাই। একটা মানচিত্র পাই। আমাদের সংস্কৃতির গন্ধ এই কবিতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। আরেকটি  বিখ্যাত গান আছে তাঁর - এই আমাদের বাংলাদেশ। সুতরাং আমরা বলতে পারি এই বাংলাদেশ নামটি কিন্ত নজরুলের দেয়া। আমাদের স¦াধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু  এই নামটিকে সানন্দচিত্তে গ্রহণ করেছেন। নজরুলের সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়েছিলো ফরিদপুরের বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসের কারামুক্তি উপলক্ষে যে সংবর্ধণা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো নজরুল সেখানে গিয়েছিলেন অতিথি হিসেবে। বক্তৃতা করেছিলেন, কবিতা পড়েছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর দেখা হয়েছিলো। তারপর থেকেই বঙ্গবন্ধু নজরুল কে ভালোবাসতেন। এখন বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ চলছে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তী এবং আমাদের বিদ্রোহী কবিতার একশ বছরপূর্তী । সব মিলিয়ে এই সময় আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি আমাদের জাতীয় কবি স্বাধীনতা যুদ্ধে কি অসম্ভব প্রেরণা যুগিয়েছিলেন । তাঁর সেই অমর গান-‘জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত! যত অত্যাচারে আজি বজ্র হানি’ হাঁকে রিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী, নব জনম লভি’ অভিনব ধরণী ওরে ঐ আগত’। অথবা দূর্গমগীরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার ; লঙ্ঘিতে রাত্রি নিশিতে যাত্রিরা হুশিয়ার। মোরা একি বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। ওরে নাহি ভয় নাহি ভয়; সত্য লভিবে জয়। মহৎ কবিতা- মানুষের চেয়ে নাহি কিছু বড় নহে কিছু মহিয়ান। বল বীর চির উন্নত মম শির’। এই লাইনগুলো কিন্তু আমাদের আপামর জনসাধারেনের মুখস্ত। নজরুল সমগ্র মানবজাতির জন্য এসছেন। কোন ধর্মীয় বেড়াজালে তাঁকে আটকানো যাবে না। আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন নজরুলকে কেউ ভুলেনি। একটা ছোট্ট গল্প বলি- আমি ২০১২ সালে তরঙ্গ অফ ক্যাফোর্নিয়ার আমন্ত্রণে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম নজরুল চেয়ার স্থাপনের একটা অনুষ্ঠানে। সেখানে একজন কুটনীতিক অতিথি হিসেবে নজরুলের একটি লাইন  ভুলভাবে বলছিলেন; কিন্তু দর্শক সারি থেকে তারঁ সঠিক শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছে। নজরুল কে মানুষ ধারন কওে তাঁর জীবনাচরণে। নজরুল ছাড়া আমরা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে পারতাম না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের বাণী মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে তা চির স্বরণীয় হয়ে থাকবে। নজরুল কখোনই তাঁর জেষ্ঠ্য কবিদের অসম্মান করেননি। রবীন্দ্রনাথকে নজরুল গুরুদেব হিসেবে ডাকতেন। বিদ্রোহী কবিতা লেখার পর জোড়াসাঁকো গিয়ে বলেছিলেন-গুরুদেব আমি তোমাকে খুন করেছি। রবীন্দণাথ পড়ে বললেন-হ্যাঁ সত্যিইতো তুই আমাকে খুন করেছিস। রবীন্দনাথ বলেছিলেন-দ্যাখ ক্ষ্যাপা তোর জীবনে শেলির মতো কিডসের মতো একটা বড় ট্রাজেডি আছে; তুই প্রস্তুত হ। নজরুল বলছেন তাঁর অভিভাষণের মধ্যে‘আমি সেই ট্রাজেডি দেখবার জন্যে মানুষকে আমার সৃষ্টি দিয়ে কতো কাঁদিয়েছি। কিন্তু আমার নিজেরই চোখ রয়ে গেল একটা শুস্ক মরুভূমি। নজরুলের পুত্র সন্তান বুলবুলের মৃত্যুতে অনেক বেশি ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তিনি বলছেন যে, পুত্র শোকে আমি যখন বিহ্বল তখন আমার বাড়ির পাশে একটা হাসনা হেনা ফুটেছিলো; সে হাসনা হেনার গন্ধ আমি প্রাণপণে নিয়েছিলাম। নজরুল মৃত্যু এবং প্রকৃতির যে সমার্থক তা তিনি সহজেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এজন্যই তিনি নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে রাখতেন। পূর্ববঙ্গের যে রূপ,রস গন্ধ তাঁর গানে পাই  তা এক কথায় অসাধারণ। যেমন ‘পদ্মার ঢেউ রে,মোর শূন্য হৃদয় নিয়ে যা। কি অভাবনীয় কি অসম্ভব সুন্দর একটি গান। আমি পূর্ব দেশের পুর নারী। কি অসাধারণ গান। এই গানগুলো শুনলে কিন্তু আমাদের হৃদয় ভরে যায়। তিনি চট্টগ্রামে গেছেন। রাজশাহীতে গেছেন। সিেিলটে গেছেন। ফরিদপুরে গেছেন। তিনি স্বন্দ্বীপে গেছেন। বাংলার এমন কোন জায়গা নেই যে তিনি যাননি। তিনি চুয়াডাঙ্গায় অনেকদিন ছিলেন। তাঁর শশুড়বাড়ী আমাদের মানিকগঞ্জ। সুতরাং নজরুল কিন্তু আমাদের আত্মার আত্মীয়। তিনি যে আমাদের জাতীয় কবি ; তাঁর প্রধান কারণ হচ্ছে তিনি জাতীর আশা আকাঙ্খাকে  এমনভাবে পূর্ণ করে দিয়েছেন তাঁর লেখনি দিয়ে যে তাঁকে ছাড়া আমাদের ঐতিহ্য কল্পনা করা যায় না। আমাদের সংস্কৃতি অসম্পূর্ণ থাকে এবং একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই নজরুলের গানগুলো কবিতাগুলো আবার নতুনভাবে পাঠ করতে পারি। পূর্ণপাঠের মাধ্যমে আমরা তাঁকে আবিষ্কার এবং  বিবেচনা করতে পারি। নজরুল কে আমাদের আধুনিকভাবে দেখতে হবে। একজন মার্কিন গবেষক উনিস্টন ল্যাংলি বলেছেন- ‘নজরুল হচ্ছেন একজন সম্পূর্ণ মানুষ; হিউম্যান হোলনেস’। তাঁর বিদ্্েরাহী কবিতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি। কয়েকদিন আগে আমি কাজাকিস্তানের একজন কবি সাজ্জাদ আত্তিকাউফের সাথে কথা বলছিলাম । তিনি বলছেন -আমরা ছোট বেলা থেকেই নজরুল কে জানি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে নজরুল আছেন। এমনকি তুরস্ক, ইরান নজরুলকে খুব ভালোভাবে চেনেন। নজরুল এখন ধীরে ধীরে সারাবিশ্বে পৌছে যাচ্ছেন। তাঁর সাম্যের বাণী,  স্বাধীনতার বাণী, গণ-মানুষের কথা যেভাবে তিনি বলেছেন । তাঁর জীবন দর্শনকে উপলব্দি করে; মানুষ তা সহজেই গ্রহণ করেছে। তিনি যে বছর জন্মছিলেন পাবলে নেরুদাও জন্মেছিলেন। নেরুদার সঙ্গে নজরুলে এক চমৎকার জীবন দর্শনের ঐক্য আছে। নেরুদা একসাথে প্রেমের ও গণ-মানুষের কবি; নজরুলও তাই। ওই সময় জন্মেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি প্রথম জীবনে নজরুলকে অনুসরণ করেছিলেন। নজরুলের ধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। নজরুলের সমকালীন এমন কোন কবি নেই যে তাঁর প্রভাবিত হননি। জীবনানন্দের মতো মহৎ কবিও নজরুলে প্রভাবান্বিত হয়ে গণ-মানুষের কাতারে এসেছিলেন। তাঁর রূপসী বাংলা পড়লে আমরা তাঁকে পাই সেরকম। আমরা কি তাঁকে শুধু প্রকৃতির কবি হিসেবেই পাই । আমি বলবো না। গভীরভাবে যদি তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখবো তিনি বলছেন-বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি;তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না। তেমনিভাবে নজরুলও কিন্তু বাংলার মুখ দেখেছেন বলে অন্য কোথাও আর যাননি। নজরুলও সপে দিয়েছিলেন তাঁর জীবন-যৌবন এই বাংলার কাছে। নজরুল সর্বমোট বাইশবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রতিবারই তিনি কোন অনুষ্ঠানে গান করেছেন কবিতা পড়েছেন। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। কুমিল্লায় তিনি যে গ্রেফতার হয়েছিলেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লিখে; সেটি কিন্তু এই বাংলাদেশ থেকেই। মূলকথা তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে আমাদের পূর্ববঙ্গে; আমাদের শস্য-শ্যামল বাংলায়। আমি পয়ত্রিশ বছর নজরুল ইনিস্টিটিউটে চাকুরি করেছে; দেখেছি মানুষের অসীম কৌতুহল নজরুলকে নিয়ে, তাঁর অসুস্থতা, প্রেম, বিবাহ, জীবন নিয়ে। সেই কৌতুলের বাইরে আমাদের নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে । তবেই আমরা পাবো আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা। তিনি প্রায় চোদ্দটি রাগ সৃষ্টি করেছেন। প্রায় চারহাজার গান, পাঁচশো কবিতা তিনি লিখেছেন। ছোটদের জন্য কি অসীম দরদ দিয়ে শিশু সাহিত্য রচনা করেছেন তা আজও আমাদের মুখে মুখে। আমরা সেই কৈশর থেকে পড়ছি ‘ভোর হলো দোর খোল খুকুমণি ওঠরে’কাঠবিড়ালী পড়ছি, লিচু চোর পড়ছি। কিম্বা পড়ছি‘ তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে। আর কতো কি । যা আমাদের সবসময় উদিপ্ত করে নিজস্বতায়। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে পাশে নিয়ে বসিয়েছিলেন এক অনুষ্ঠানে। তখন অনেক বিদগ্ধজন প্রতিবাদ করেছিলেন -আপনি কেন এই ছোঁকরাকে আপনার পাশে বসিয়েছেন। পাত্তা দিচ্ছেন গুরুদেব। তখন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তোমরা এখনো নজরুল কে চিনতে পারোনি। তোমারা গভীর ভাবে নজরুলের কবিতা পাঠ করোনি। এটা তোমদের আবদার বটে যে কবিতায় অসীর ঝনঝনানি থাকবে না। যে কবিতা, যে সঙ্গিত যুগের দাবী মেটায় তা কাব্য নয় মহাকাব্য। অথ্যাৎ রবীন্দনাথ নজরুলকে মহাকবি হিসেবে আর্শিবাদ করেছিলেন ধূমকেতু পত্রিকার প্রকাশ উপলক্ষ্যে।‘চলে আয় রে ধূমকেতু; আঁধারে। সুতরাং নজরুল এবং রবীন্দনাথের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন ; মূলত তার না জেনেই কথা বলেন। ওসব কথা শুনতে নেই। রবীন্দ্রনাথ নজরুল দুজনই আমাদের জাতীয় সম্পদ। সেই গানটিকে আমি বারবার স্মরণ করি সবার হৃদয়ে রবীন্দনাথ চেতনাতে নজরুল।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: বাংলা কবিতার ভবিষৎ নিয়ে কিছু বলুন।

রেজাউদ্দিন স্টালিন; সাম্প্রতিক কবিতার যে অবস্থা , দা দেখে বলতে হয় বাংলা কবিতার অবস্থা ভালো না । এটি একটি দুঃসংবাদ। পাশাপাশি একটি সুসংবাদ; সেইসব তরুণ যারা সচেতনভাবে কবিতা রচনা করছেন। যারা ভাবেন চিন্তার মুক্তি আন্দেলন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা। যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে শিল্পকে মানুষের কাতারে নিয়ে যেতে চান তাঁদের হাতে নতুন কবিতা রচিত হবেই।  সেটা আমরা দেখেছি চল্লিশ পঞ্চাশ, ষাট-সত্তর আশির দশকের কবিদের হাতে, সাম্প্রতিককালে বাংলা কবিতা অভিভাবকহীন। কারণ; কোন প্রাজ্ঞ সাহিত্য সম্পাদক নেই। জেষ্ঠ্য কোন সাহিত্য সম্পাদক নেই। না থাকার কারণে বাংলা কবিতা পিতৃহীন। যেসব অর্বাচীনদের হাতে বাংলা কবিতার দায়িত্ব পড়েছে সাহিত্য সম্পাদনার; তারা না জানে ছন্দ, না জানে কবিতা , না জানে গদ্যের রীতি। তারা কিছু উপটৌকনের মাধ্যমে সাহিত্য বাণিজ্য করে থাকেন। যা থেকে কোন প্রতিভাবান তরুণ কবি জন্মগ্রহণ সম্ভব নয়। এই সব কলুষিত সাহিত্য সম্পাদক থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে হবে। আমরা আহসান হাবিব, সিকান্দার আবু জাফর, আজিজুল হক, আল মুজাহিদী, শিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আতাহার খান, নাসির আহমেদ, আবুল হাসনাদের মতো সম্পাদকদের আমরা হারিয়েছি। পাচ্ছি না। এখনও যে গুটি কয়েকজন মানুষ বেঁচে আছেন আতাহার খান , নাসির আহমেদ, মাহবুব হাসান । এরাও যদি কোন পাতা সম্পাদনা করতেন তাহলে আমরা কিছু অভিভাকত্ব পেতাম। কিন্তু যাদের হাতে আজ এই দায়িত্ব তা একটি মাৎস্যন্যায় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের খেয়াল খুশি মতো সাহিত্য পাতা রচিত হচ্ছে। ভালো কবিতা, ভালো লেখক সেখানে অবহেলিত। মফস্বলের তরুণ কবিতা সেখানে অবহেলিত। একটি খাম এখন আর খুলেও দেখা হয় না। অনেকে দেখা যায় ইমেইল করতে পারে না; তারা ডাকে পাঠাতে চান। তাদের লেখাটি নেয়া হচ্ছে না টাইফ করার ভয়ে। একটা শ্রমহীনতা আমাদের সাহিত্যকে খুবলে খাচ্ছে। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অস্থিরতা। মুখচেনা .গোষ্ঠীবদ্ধতা, কিছু সুবিধা নিয়ে লেখা প্রকাশের আমি তীব্র নিন্দা জানাই। এই জায়গা থেকে যদি আমরা বের হতে না পারি তাহলে আমাদের সাহিত্য , কবিতা ছিনতাই হয়ে যাবে। নতুন এক অন্ধকার আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে । আমরা পাবো না কোন অন্ধকার সময়ের বাতিওয়ালা। পৃথিবীর অনেক দেশের কবি-সাহিত্যিক, সম্পাদকের সাথে আমার আলাপ আছে। তার এই বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস। তাঁরা একটি কবিতা পেলে প্রথমে পড়েন এবং ছাপানোর উপযুক্ত হলে ছাপেন। না হলে লেখককে তা জানিয়ে দেন। এই যে কৃতজ্ঞতাবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় । কবে আমরা আবার পাবো অভিভাবক বাংলা কবিতার সাহিত্য । আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় , কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে; লেখকের ক্ষমতা বিচার করা হয়, কে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত, কে সরকারি কর্মচারী, কে বিভিন্ন পলিসি মেকারের সাথে সংযুক্ত, কে কাস্টমসের বড় কর্মকর্তা; তাদের লেখা ছাপানোর হিড়িক লেগে যায় । আমি তাদের লেখাকে খাটো করে দেখছি না। আমাদের এই নোংরামি বন্ধ করতে হবে। সাহিত্য শয়তান থেকে কবিতা মুক্ত করতে হবে। তবেই আমারে কবিতা আবার ফিরে পাবে তাঁর হারানো ঐতিহ্য। কবি ওমর আলীর মতো কবি অবহেলায় হারিয়ে গেলেন আমাদের ভিতর থেকে। কবি আজিজুল হক একজন শক্তিমান কবি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছেন। আমরা কজন তাঁকে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছি। উত্তরাধিকার বের হচ্ছে । সাহিত্যের জন্য আরও কাজ করা দরকার । কেননা সাহিত্য শিল্পবোধই একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে তোলো। সর্বোপরি অসৎ লোকদের হাত থেকে কবিতা কে মুক্ত করতে হবে। আর তা তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের পক্ষে সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- সে কবির লাগি কান পেতে আছি; জন্ম যার মাটির কাছাকাছি’।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: এপার বাংলা ওপার বাংলা সাহিত্যের মিল অমিল কি । আমরা কেন আলাদা হলাম।

 রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমরা দুই দেশের অধিবাসীরাই বাংলা ভাষায় কথা বলি। পার্থক্য কোথায়, কেন? তাহলে বলা যায়; বাংলাদেশের মানুষ তথা এই বঙ্গের মানুষ সংগ্রামশীল। আমরা সাতচল্লিশে দেশ ভাগ দেখেছি। আমরা নতুন ষ¦প্ন নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের অধিবাস গ্রহণ করি। আমাদের নতুন পরিচয় হয়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই আশা ভঙ্গ ঘটে। এক এক করে পাকিস্থান  আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে একটা আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে গ্রাস করতে চায়। সেখান থেকে মুক্তি পাবার জন্যে আমরা উনপঞ্চাশ সালে আন্দোলন শুরু করি। আমরা বায়ান্ন সালে মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষার জন্যে রক্ত দেই। যদিও সেই সময় আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন আন্দোলনে তখন কবিরাই এগিয়ে এসেছেন নতুন বাংলা নির্মাণে। চারজন কবির নাম স্পষ্ঠভাবেই ইতিহাসে আছে আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবুল হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান। এরা কিন্ত সামনে এসেছিলেন এবং নির্ভয়ে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে । তাঁদের সেই দুর্বার সাহসিকতাই প্রমাণ করে ভাষার প্রতি এই বঙ্গের মানুষের কি অবদান। পরবর্তীকালে উনসত্তরের গণঅভূথ্যান। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দেলনের ধারাবহিকতায় সত্তর সালের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই যে রক্তধোয়া আমাদের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সংগ্রাম , আমাদের মাতৃভাষা তাঁর সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গের মানুষের যে পৃথকিকরণ সাধিত হলো আন্দোলনের রূপরেখার মধ্য দিয়ে । আমরা আন্দোলন করে একটা জীবন্ত ভাষাকে পেয়েছি। আমাদের হৃদয়ের মধ্যে আমাদের আত্মার মধ্যে সেটা ধারন করি। ওপার বাংলায় কিন্তু তা নেই। পশ্চিম বাঙ্গের সাহিত্য একটা মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই দাদা বৌদিরের প্রেম। কিম্বা টাঙ্গাওয়ালা, চাওয়ালা, একজন কেরানীর জীবন । কবিতায় কিছু অন্তমিল তৈরি করে একটু ছন্দের জাদু তৈরি করে তারা কবিতা লিখতে চান। সম্প্রতিকালের কিছু কবির কবিতা আমার চোখে পড়েছে; আমি খাটো করছিনা পার্থক্য নির্ণয় করছি মাত্র। কোন অর্থ না হলেও আমরা অন্তমিলে চমকিত হই। আর পাশাপাশি বাংলাদেশের কবিতা অন্তমিলসহ এক নতুন অর্থ তৈরি করে। সেই অর্থ হলো আত্মার মুক্তি, ভাষার মুক্তি, চিন্তার মুক্তি এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। আমাদের ভাষায় আছে নদীর কল্লোলতা। আমাদের সাহিত্য মাঠের তাজা সবজির মতো আর পশ্চিম বঙ্গের সাাহিত্য হচ্ছে ফ্রিজে রাখা সবজির মতো। সুতরাং আমি একবাক্যে স্বীকার করে নিতে পারি; বাংলাদেশের কবিতা অনেক বেশি সতেজ, অনেক বেশি গণমুখী, আমাদের কবিতার পার্থক্য সহজে নির্ণয় হয় এভাবে যখন আমরা গ্রামীণ লোকজ শব্দগুলো অনায়াসে আমাদের কবিতায় ব্যবহার করি। সেটিতে আমাদের মান যায় না; আমাদের আভিজাত্য নষ্ট হয় না। কলকাতার সাহিত্যে যার উপস্থিত খুব কম। আমাদের আল মাহমুদ, জসীমউদ্দিন, শামসুর রহমানের কবিতায় কিন্তু গ্রামীণ জনপদের ভাষা লুকিয়ে আছে। এবং সহজেই আমাদের কবিতা পশ্চিম বঙ্গের কবিতা থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আল মাহমুদ যখন বলে-গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল; আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে; কবিতাতো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়শা আক্তার। তখন আমাদের কবিতা কোথায় আলাদা সেটি নতুন করে বোঝাতে হয় না। শামসুর রহমান যখন বলেন-স্বাধীনত্ াতুমি রবী ঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান; স্বাধীনতা তুমি ঝাকড়া চুলের বাবরি দোলানো সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা মহান পুরুষ’। একমাত্র তখনই আমরা আমাদের কবিতা আলাদা করে ফেলি। আহসান হাবীব যখন বলেন-আমি কোন ভিনদেশী পথিক নই;আমি কোন আগুন্তুক নই ; আমি এখানে ছিলাম এখানে থাকার নাম সর্বত্রই সারাদেশে থাকা। এই যে উচ্চারণ তা আমাদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। আলাউদ্দিন আল আজাদ যখন বলেন-ইটের মিনার ভেঙ্গছো তোমরা; এখনো আমরা দাঁড়িয়ে আছি আট কোটি পরিবার। রফিক আজাদ যখন বলেন-ভাত দে হারামজাদা;নইলে মানচিত্র খাবো।। এই কথাগুলো যখন এখানকার কবিতায় ধ্বনিত হয় তখনই কিন্ত আমরা আলাদা হয়ে যাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে। হেলাল হাফিজের কবিতায়- এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আমরা আলাদা হতে থাকি। বর্তমান বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি নির্মলেন্দু গুণ যখন বলে- আমার হৃদয়ের মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র এখনো জমা দেইনি। এই যে আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া সেটা শুরু হয়েছে পঞ্চাশের দশক থেকে সেটি এখনো চলছে তরুণ কবিদের হাত ধরে। আমাদের কবিতা আমরা আলাদা করে নেই ভাষা ভঙ্গিতে, কাব্যরীতিতে, উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, আমাদের বর্ণনায়, আমাদের জীবন-যাপনে

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: আপনার কবিতার আলাদা বৈশিষ্ট্য কি?

রেজাউদ্দিন স্টালিন: এই যে কবিতার নতুন যাত্রা শুরু হয় আশির দশকের একবারে শুরু  থেকেই। আমার প্রথম বই বের হয় ১৯৮৬ সালে বই মেলায় ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি”। আমি লক্ষ্য করি আমার বইটি প্রকাশের পর থেকেই আমার অগ্রজ কবিরা, সুধিজনেরা গ্রহণ করেন বইটি। নামকরণের পাশাপাশি আমার কবিতাগুলোকে গ্রহণ করেন তারা। আল মাহমুদ আমার এই কবিতার প্রকাশনা উৎসবে বলেছিলেন‘এরকম একটি কবিতাই আমি লিখতে চাই। আমাকে এভাবেই অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন রাহাত খান, শামসুর রহমান, রফিক আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, হাবিবুল্লাহ সিরাজী,নূরুল হুদা। এরা সবাই কিন্তু আমার কবিতার সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। এভাবেই আমার যাত্রা । এই যাত্রাকে বরণ করে নিয়েছিলেন অমাদের অনেক জেষ্ঠ কবিরা। মোহাম্মদ রফিক, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এরা আমার বই কিনেছিলেন । আমার জন্যে তা ছিলো অত্যন্ত সৌভাগ্যের। সে সময় কবিতার বই পাঠকরা কিনতেন এখন যেমন তুলনায় কম হচ্ছে; মন্দাভাব। এর প্রধান কারণ আমাদের কবিতা গণমানুষের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। কবিতা তাঁদের মনের কথা বলতে পারছে না। আমরা আশির দশকে সেটা বলতে চেয়েছি। আমরা কবিতায় নতুন ইমেজ, নতুন অলংকার দিয়েছিলাম। অতিবাস্তবতা, সম্প্রসারিত বাস্তবতা, অনুপস্থিত বাস্তবতা কবিতায় প্রাধান্য দিয়েছিলাম। আমার কবিতায় পাঠক পাবেন গ্রীক পুরাণ, আরব্য পুরাণ,ভারতীয় পুরাণ, মিশরীয় পুরাণ, রোমক পুরাণ, ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি প্রাসঙ্গিকভাবে। বর্তমান সময়ে চারিত্রিক বিবেচনায় সেই পুরোনো চরিত্রগুলোকে বিন্যাসের চেষ্টা করেছি। যেমন এখনকার একিলিস, হারকিউলিস, ক্লিওপ্রেট্টা, মোজেস,যীশু কেমন হবে। এখনকার অর্জুন, লক্ষণ কি ভূমিকায় দাঁড়াবে। এই জায়গাগুলোতে কাজ করতে গিয়ে আমার কবিতা অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছি। আমি মনে করি বাংলা কবিতায় মিথের ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি আমার সামান্য কোন ইমেজ তৈরি নতুন সংযুক্ত করতে পারি। তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো। হাজার হাজার বছরের এই যে পথ পরিক্রমা; এখানে যদি একটি লাইনও যদি আমি লিখতে পারি তাহলে আমি নিজেকে গৌরাবন্বিত মনে করবো। এই কাজে আমাকে সবচেয়ে বেশি সহযোগীতা করেছেন আমার পাঠক। আমি সব সময় পাঠকের দিকে নির্মোহ চোখে তাকিয়ে থেকেছি। অনেকে মনে করে আমি কোন কিছু বিবেচনা করে লিখিনা আমি আমার আনন্দের জন্য লিখি;আমি তা করি না। আমার তখনই আনন্দ হয় যখন একজন পাঠক আমার লেখাকে তাঁর হৃদয়ে লালন করেন। যদি পাঠকের ভালো না লাগে তবে সব কিছুই নিরর্থক। সবচেয়ে বড় কথা আমরা কবিতার দশক বিবেচনা করে কবিতার ক্ষেত্র কে ছোট করে আনি; এটা কিন্তু কোন কাজের কথা নয়। একজন কবি যখন তাঁর দশককে অতিক্রম করে যান তখন কেন আমরা তাঁকে সংকুচিত করবো। কবিতো সব দশকের কবি। যদি তাঁর লেখা সেই মানের হয়। বাংলা কবিতার সামনের পথগুলোতে আমাদের এই বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আমরা কবিতায় গণমানুষের কথা লিখবো তা যেন অবশ্যই শিল্প মানের হয়। কবিতার সমৃদ্ধি, দর্শনকে উপেক্ষা করা যাবে না। মুলত নতুন কিছু করার নিমিত্তেই আশির দশকে কবিতার অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম। বাংলা কবিতায় আবেগের বাহুল্য ছিলো খুব বেশি। মতো- ব্যবহার বর্জন করেছি। মতো কে বাদ দিয়েই একটা নতুন উপমা সৃষ্টির চেষ্ট করেছি। একটা জ্যামিত্যিক অন্বেষণ করেছি কবিতায়। আমি উপমা উৎপ্রেক্ষাকে এক করে দিতে চেয়েছি। যা আশির দশকের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আজকাল কবিতার অনেক বেশি ইমেজ দেখা যায় । যার কারণে পাঠক দূরে সরে যাচ্ছেন । যা কাম্য নয়। আমাদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে গণমানুষের আকুতি বুঝতে পারা; সেটি যদি না বুঝা যায় তাহলে পাঠক কবিতা গ্রহণ করবে না। সর্বোপরি আমি মনে করি যতটুকু সাহস ততটুকুই শিল্প, ততটুকুই কবিতা।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: জন্ম মৃত্যু নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?

 রেজাউদ্দিন স্টালিন: একজন কবির জন্ম এবং মৃত্যু ভাবনা অবশ্যই থাকতে হবে। উপনিষদের কথাই বলতে হয়- মানব জন্ম আনন্দময়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে;মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। আমি মনে করি জীবন অবশ্যই আনন্দময়। জন্ম খুব আনন্দময়। তাঁকে উদযাপন করতে হয়। একটা স্বপ্ন নিয়ে মানুষকে এগোতে হয়। হয়তো বাধা থাকে। হয়তো অনেক সংকটপন্ন সময় আসে, হয়তো ব্যাধি করাল গ্রাস মানুসকে স্তব্ধ করতে চায়। তবুও এগিয়ে যেতে হয় জীবনকে প্রসব করে । সেখানেই নতুন সুখ । সক্রেটিস বলেছেন- আমরা জানি না; আমরা যারা বেঁচে আছি কিম্বা আমরা মরে যাচ্ছি কোনটা সঠিক; কোনটি সুন্দর’। আমরা যদি মানুষের জন্য কাজ করি, জগতের জন্য কাজ করি; যদি শিল্প এবং সৌন্দর্যের জন্য কাজ করি তাহলে মানুষের অন্তরে থাকবো। সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে জানবার চেষ্টা করবো। আত্মসমালোচনা করবো। 

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: কবি না হলে কি করতেন?

রেজাউদ্দিন স্টালিন: আমি যদি আরেকবার জন্মাই তাহলে কবি হয়ে জন্মাবো। আমি যদি তৃতীয়বার জন্মাই তাহলেও কবি হয়ে জন্মাবো। বারবার জন্মাবো কবি হয়ে। যদি কবি না হতে পারতাম তাহলে অভিনয় জগতের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতাম। সেখানেও নিজেকে প্রকাশ করা যায় । আমি যতোবার জন্মাবো ততোবার কবি হয়ে জন্মাবো।

ফারুক মোহাম্মদ ওমর: আপনাকে ধন্যবাদ।

রেজাউদ্দিন স্টালিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

করোনার চেয়েও ভয়ংকর এএমআর মোকা.....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক : অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা ওষুধের বিরুদ্ধে জীবাণুদের প্রতিরোধ .....

'মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন বলেছেন, সিভিএফ সভাপতি এবং প্রধানমন.....

ইফতার এবং সাহরীতে পানি সরবরাহ .....

নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র রমজান মাসে ইফতার এবং সাহরীর সময় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের জন্য ঢাকা ওয়াসাসহ দেশের .....

আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষ.....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন

বাংলা নববর্ষ ১৪২৮ উপলক্ষে আজ (১৩ এপ্রিল) মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দ.....

মামুনুলকে বহিষ্কারের কোন প্র.....

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম), প্রতিনিধি

মানুষকে রমজানে শান্তিপূর্ণভাবে রোজা রাখার সুযোগ দিতে হবে। মাহে রমজানে .....

চলে গেলেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক হ.....

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা : জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক প্রবীণ সা.....

এবার পহেলা বৈশাখ পালনে নিষেধা.....

ডেস্ক রিপোর্ট

করোনার সংক্রমণ উর্ধ্বমূখী হওয়ায় আগামী ১৪ এপ্রিল বাংলা বছরের প্রথম দিনটি জনসমাগম করে পালনে.....

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য লোকশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে গভীর শ.....

দু’দিন পর স্বচল হলো গণপরিবহন .....

স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘোষিত লকডাউনে দু’দিন বন্ধ থাকার পর আজ আবারো শুরু হয়েছে গণপরিবহন চ.....

আরও বাড়তে পারে তাপমাত্রা .....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক :

অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে বলে জ.....

কাল থেকে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে .....

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামীকাল (সোমবার) থেকে গণপরিবহন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়.....

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবা.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : কৃষিমন্ত্রী ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেছেন, বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি হয়.....