• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে ২০২১ | ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮
অন্ধকারে ফুলের সুবাসের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে আলোর দেখা পেলো।

রহস্যময় তমাল জালাল খান ইউসুফী

রহস্যময় তমাল  জালাল খান ইউসুফী

সাহিত্য কন্ঠ: গল্প

রহস্যময় তমাল

জালাল খান ইউসুফী

রোজ রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে দেরি করে বাসায় ফিরে তমাল। ওরা এক ঝাঁক বন্ধু। সবাই প্রতি সন্ধ্যায় একত্র হয়। গল্প করতে করতে কিভাবে যে রাত ১২টা ১টা হয় যায়। কেউ বুঝে উঠতে পারে না। প্রতিদিন একই অবস্থা হয়। আড্ডা দিতে দিতে বাসায় ফেরার কথা কারোরই মনে থাকে না। হঠাৎ দলের কেউ একজন বলে উঠবে

এই যা, রাত একটা।

সাথে সাথে চমকে ওঠে আড্ডারত সবাই। তড়িগড়ি করে উঠে যে যার বাসার দিকে রওয়ানা করে। এভাবে রোজ দেরি করে বাসায় ফিরে তমাল। ফারজুর মা ওর বড় ভাবী। কতোবার দেরি করে ফিরতে নিষেধ করেছেন তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তমাল তার ইচ্ছা মতো আড্ডা দিয়ে রাত করে বাসায় ফিরে।

আজো ফিরতে ফিরতে রাত একটা হবে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। কারণ এই কিছু সময় পূর্বে তাদের আড্ডা শেষ হয়েছে, তখন রাত বারোটা ত্রিশ মিনিট। 

অন্ধকারে একা হাঁটছে তমাল। রাতের প্রকৃতি নীরব। হাঁটতে হাঁটতে সে মেয়েলি  কণ্ঠের কান্না শুনতে পেলো। সুবাসিত ফুলের এক রাশ ঘ্রাণ এসে তমালের নাকে প্রবেশ করলো। আশ্চার্য! এ পথে রোজ যাতায়াত করে। কখনো ফুলের ঘ্রাণ দূরে থাক, একটা ফুলের গাছও চোখে পড়েনি। আজ হঠাৎ করে ফুলের ঘ্রাণ পেয়ে অবাক হলো সে। ঘ্রাণটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে তার। যেদিক থেকেই ঘ্রাণ নিতে চেষ্টা করে মনে হয় সব দিক থেকেই ঘ্রাণ আসছে। 

অন্ধকারে ফুলের সুবাসের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে আলোর দেখা পেলো।

দেখলো সামনে শাড়ি পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে মেয়েটির কাছেই যেনো আলোর বাতি। না হলে এমন উজ্জ্বল আলো কী ভাবে আসে! সামনে এগিয়ে যায় তমাল। অপূর্ব রূপবতী একটি মেয়ে তমালের সামনে দাঁড়ানো। মেয়েটির শরীর থেকেই আলোর বিচ্চুরণ বেরুচ্ছে। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে আছে রাতের প্রকৃতি। মেয়েটির পিঠে ছড়িয়ে আছে লম্বা মেঘ কথো চুল। মেয়েটির দু’চোখে অশ্রু। তমালের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে সে বললোআমাকে ক’টা টাকা দেবেন? আমি সারাদিন কিছু খাইনি। ক’টা টাকাদিলে বাজার থেকে কিছু কিনে খেতাম।

 

বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে নিজের অজান্তেই যেন তমালের ডান হাত চলে যায় বুক পকেটে। পকেটে এক‘শ’ টাকার একটা মাত্র নোট ছিল। সেই নোটটাই বের করে মেয়েটির হাতে তুলে দেয়। টাকাটা হাতে নিয়ে তমালকে অতিক্রম করে চলে যায় মেয়েটা। তমাল আর ঘুরে না দাঁড়িয়ে মেয়েটির প্রতি না চেয়ে কি মনে করে যেন বাড়ির দিকে যেতে থাকে।

 কে এই মেয়ে? কোথা থেকে এলো? আর যাবেই বা কোথায়? এবং এতো রাত পর্যন্ত কেনোই বা না খেয়ে আছে? কোনো কিছু ভাবার প্রয়োজন মনে করল না তমাল। সোজা বাড়ি গিয়ে দরজায় টাচ করলো। প্রতিদিনের মতো তার বড় ভাবী গেট খুলে দিলেন। তমাল তার ভাবীকে অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলো। ভাবী বুঝতে পারলেন তমালের শরীর থেকে কাঁচাফুলের ঘ্রাণ বেরুচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল তমাল। সকাল ছয়টায় তমালের রুমের গেটে টোকা পড়ল। কে একজন আগন্তক দরজায় বার বার টোকা দিচ্ছে। প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় করে এসময়- তমালের ভাবী কিচেনে নাস্তা তৈরি করেন। আজো তাই করছিলেন তিনি। পাশেই মায়ের সাথে থেকে এটা ওটা নাড়াচড়া করছে ছোট্ট মেয়ে ফারজ্।ু ফারজুর দাদী নামাজ পড়েই শুয়ে ঘুমে অচেতন হয়ে আছেন। তেমনি ফারজুর বাবাও।

ভাবী মনে করলেন, নিশ্চয়ই তমালের কোনো ফ্রে- এসেছে। তমালই দরজা খুলবে। কিন্তা না। তমাল উঠছে না। ওদিকে দরজায় বার বার টোকা পড়ছে। বিরক্ত হয়ে কিচেন থেকে আসতে আসতে আপন মনে বললেন-

ধ্যাত! এতো ভোরে কেউ কারো বাসায় যায়!

দরজা খোলতে খোলতে বললেন

কে আপনি? তমাল এখনো ঘুমুচ্ছে।

আগন্তকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। দরজা খুলে অবাক হলেন ভাবী। বাইরে কেউ নেই। কিন্তু এতোক্ষণ দরজায় টোকা দিয়ে কে ডাকলো তাহলে? বাইরে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন তিনি। কোথাও কাউকে দেখা গেলো না। দরজা বন্ধ করে কিচেনে চলে আসলেন। 

কিছুটা ভয় ভয় লাগছে তার। স্পষ্ট দরজায় টোকা দেয়ার শব্দ শুনেছেন তিনি। একবার দুবার নয়। অনেক বার দরজায় টোকা পড়েছে। দরজা খুলে কাউকে পওয়া গেল না। এমন ভুতুড়ে অবস্থায় ভয় বা আশ্চর্য না হয়ে পারে না কেউ। কেনো যেন তারও ভয় ভয় লাগছে। 

কিছু সময় পর দরজায় টোকা পড়লো আবার। দৌড়ে এসে দরজা খোললেন। কিন্তু না। এবারো কাউকে পাওয়া গেলো না। ভারী বিরক্ত লাগছে তার। সাথে ভয় তো আছেই। ফের চলে এলেন কিচেনে। ফের টোকা পড়লো দরজায়। এবারো দরজা খুলে কাউকে পেলেন না। 

 

কি আশ্চার্য রে বাবা। ফাজলামুর একটা সীমা থাকা উচিৎ। দরজা বন্ধ করে ধমরে সুরে তমালকে ডাকলেন ভাবী। ডেকে ডেকে বললেন

‘বারবার দরজায় কে যেন নক করছে। তুমি উঠে দেখনা কেনো। কোন রাজকন্যা তোমাকে ডাকে’। 

বলতে বলতে কিচেনে ফিরে এলেন। আরো কিছু সময় পর শোনা গেলো সেই একই ভাবে দরজায় টোকা পড়ার শব্দ। সাথে সাথে ভেতরের দরজা দিয়ে তমালের রুমে গিয়ে ওকে ঠেলে তুলতে তুলতে বললেন

দেখো, দেখো,  কে এলো দেখো।

তমাল উঠে দু’হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো। কিছু সময় পর হাসি হাসি মুখে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। দূর থেকে দেখে অবাক হলেন ভাবী। জানতে চাইলেন, কে এসেছিলো? কিন্তু তমাল কোনো প্রতি উত্তর করলো না। সাথে সাথে এপাশের দরজা খুলে বাইরে বের হলেন ভাবী। আরে, একি! পুরো বাড়িটাই যেন সুবাসিত ফুলের ঘ্রাণে মোহিত হয়ে আছে। ভাবীর চোখ পড়লো জানালার গ্রীলে। তরতাজা একটি বেলী ফুলের মালা ঝুলে থাকতে দেখে সেটা পেড়ে আনলেন। মনে হয় এ ফুল থেকেই ফুলের সুবাস বেরোচ্ছে। আর মনে হচ্ছে এই মাত্র কেউ কোনো বাগান থেকে ফুল তুলে এনে মালা গেঁথে রেখেগেছে। আর এ মালা থেকেই ঘ্রাণ বেরুচ্ছে।

সকাল আটটার দিকে তমাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে প্রতিদিনের মতো ইউনির্ভাসিটিতে চলে যায়। বিকেল চারটার দিকে বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে একটু রেষ্ট নিয়ে সন্ধ্যার পূর্বে আবার বের হয়। নিমানুযায়ী রাত করে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে। রাতের খাবার খেয়ে শরীর এলিয়ে দেয় বিছানায়। কখন দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে বলতে পারে না। 

খুব ভোরে ভাবীর ডাকে ঘুম ভাঙ্গে তমালের। গত কালের সেই একই সমস্যার জন্য ভাবী তাকে ডেকে দেন। ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায় তমাল। কিছু সময় পর হাসি হাসি মুখে ফিরে আসে নিজের রুমে। হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে চুপচাপ। 

ভাবী তার কাজকর্ম সেরে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখেন সেই পুরনো জায়গায় গতকাল যেখানটায় ফুলের মালা পেয়েছিলেন ঠিক সেখানটায় একই রকম তরতাজা একটা বেলী ফুলের মালা ঝুলছে। 

এখন প্রতিভোরেই এক্ই জায়গায় একই রকম ফুলের মালা পাওয়া যাচ্ছে। কে বা কারা রেখে যাচ্ছে তা কেউ বলতে পারে না। সেই ফুলের ঘ্রাণে পুরো বাড়িটা বিশেষ করে সকালে মুখরিত হয়ে থাকে। অবাক হওয়ার মতো বিষয়টা হলো ফুলের সুবাসটা তমালের রুমেই বেশি পাওয়া যায়। অলৌকিক ভাবে তমালের আচরণে দেখা যায় পরিবর্তন। সে এখন আর রাত করে বাসায় ফিরে না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়াটা একে বারে ছেড়েই দিয়েছে। একেবারে একা থাকাটা ওর যেনো পছন্দনীয় হয়ে গিয়েছে। পূর্বে সে বাসায় থাকলে ছোট মেয়ে ফারজুর সাথে গল্প করেই সময কাটাতো। কিন্তু এখন সে সব সময় দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে একা থাকে। মাঝে মাঝে বাইরে বেরুলে ফিরে আসে সন্ধ্যার পর পর। এসে হাসতে হাসতে ভাবীতে বলে

ভাবী আজ আসার সময় মিষ্টি খেয়ে এলাম। মিষ্টি এতো মজা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না ভাবী। এমন মজাদার মিষ্টি আমি কোথাও খাইনি।

তমালের কথা শুনে ভাবী আগ্রহ নিয়ে জানতে চান

এতো মজাদার মিষ্টি তোমাকে কে খাওয়ালো?’

ভাবীর প্রশ্ন শুনে কেমন যেন অন্য রকম হয়ে যায় সে। আনমনা হয়ে কি উত্তর দিবে তাই যেন খুুঁজতে থাকে। ভাবীর প্রশ্নের উত্তরে কখনো বলে, ‘রাস্তায়’ আবার কখনো বলে ‘বাজারে’। কোনো কথার সাথে কোনো কথার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হয় সে কোনো কিছু লোকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তাই দেখে ভাবীও আর কোনো প্রশ্ন করেন না। 

আবার কোনো দিন সে বাসায় ফিরে একই ভাবে বলবে- আজ ‘আপেল খেলাম’। কোনোদিন বলবে, আঙুর বেদানা আরো বিভিন্ন ধরনের ফলেরর নাম করে বলবে, খুব মজা করেই খেয়েছি। কিন্তু কে খাওয়ালো, কোথায় খায়ালো এসব প্রশ্ন করলেই সে অস্বাভাবিক থেকে আরো বেশি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শরীর থেকে তো কাঁচা ফুলের গন্ধ আসতেই থাকে। ভাবী যখন দেখেন তমাল প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে তখন আর প্রশ্ন করে ওকে বিরক্ত না করে জানতে চান

ভাত খাবে?

হ্যা ভাবী, প্রচ- ক্ষুধা পেয়েছে, তাড়াতাড়ী ভাত দাও।

খাবার এনে দিলে ঘরের সব খাবার শেষ করেও তার পেট ভরে না। সবাই তাকে বুঝতে চেষ্টা করেন। আবার রান্না হচ্ছে, রান্না শেষ হলেই খেতে দেয়া হবে। এভাবে তোষামোদ করে খাবার টেবিল থেকে ধরে নিয়ে বিছানায় বসানোর সাথে সাথে মদ খাওয়া মাতালের মতো ধপাস করে শুয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় তমাল। শুরু হয় কান্নার রোল। তমালের বুড়ো মা, বড় ভাবী, বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে ফারজু সবাই কান্নাকাটি করে। 

ভাবী তার দেবরের মাথায় পানি ঢালেন। মা তার অতি আদরের ছোট ছেলের শরীরে পবিত্র কোরআন শরীফের বিভিন্ন সূরা পড়ে ফু দেন। তবুও কিছুতেই কিছু হয় না। আট/দশ মিনিট পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে একা একাই বিছানায় উঠে বসে। চোখ দুটো আগুনের ফুলকির মতো লাল হয়ে থাকে। এখন আর পূর্বের কথা মনেই নেই। এমন ভাব দেখা যায় তার আচরণে। 

তবুও সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচে। শেষ পর্যন্ত জ্ঞান ফিরে পেয়েছে ছেলেটা। 

 সে প্রশ্ন করে

আমি এখানে কেন?’

মুখ চাওয়া চাওয়ি করে সবাই। কিছু সময় পূর্বের ঘটনা এখন আর মনে নেই তমালের। কেউ কোনো কথা বলে না। 

তমাল বলে,

‘আমার খুব ক্ষুদা পেয়েছে। এক্ষুনি আমাকে খাবার দাও।

কথা শুনে দৌড় দেন ভাবী। তিনি আগেই জানতেন তমাল ঘুম থেকে উঠেই ভাত চাইবে। কারণ পূর্বেও সে এরকম করেছে। বিপদে পড়লেন ফারজুর মা। এখন তিনি তমালকে কি খেতে দেবেন। এই তো প্রায় পনের মিনিট পূর্বেই সে ফ্যামিলির সবার খাবার একাই সাবার করে দিয়েছে। যা ইদানিং তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই তিনি ভাত বসাচ্ছিলেন চুলায়। চাল দেয়া শেষ করে গ্যাসের চুলাটা একটু বাড়াতে যেতেই ফারজুর চিৎকার শুনতে পান। সাথে সাথে দৌড়ে এ রুমে এসে দেখতে পান অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তমাল।

আবার শুরু হয় কান্নাকাটি। সুরা কেরাত পড়ে ফু দেয়া। কিছু সময় বাসার সবাই উত্তেজনাময় পরিস্থিতি পার করলেন।

তার পর জ্ঞান ফিরল তমালের। আর সাথে সাথেই খাবার চাচ্ছে সে। একটু ধৈর্য্য ধরতে বলে উনুনে গিয়ে শেষে গরম গরম ভাত খেতে দেন তমালকে। এখন সে স্বাভাবিক ভাবেই খাচ্ছে। অল্প খাবার খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ল তমাল। অথচ কিছু সময় পূর্বে রাক্ষস খোক্ষসের মতো সবার খাবার একাই খেয়েছিল। বউ আর শ্বাশুড়ী একজন অন্যজনের দিকে তাকালেন। দুজনেই কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। তোয়ালায় মুখ মুছতে মুছতে তমাল তার রুমে চলে গেল। ফারজুর মা‘তার শ্বাশুড়ীকে বললেন

মা, আমার মনে হয় তমালকে দৈব কোনো কিছুতে আছর করেছে। কিছুটা বিরক্ত বোধ করলেন শ্বাশুড়ী, বললেন

   কি বলো ফারজুর মা! আমার ছেলেকে দৈব কোনো কিছুতে কেনো আছর করবে?

আছর করার মতো তো কতো কিছুই আছে না। জ্বীন পরী ভূত পেত্নী ওরা কি মানুষের উপর আছর করে না? তা করে। তাই বলে পুরুষের উপর? সারা জীবন শুনলাম ওরা মেয়েদের উপর আছর করে, ছেলেদের উপর আছর করবে কখনো শুনিনি।’

মা ও দাদুর কথা শুনে ভয় পাচ্ছে ফারজু। মায়ের আঁচল তলে থেকে কিছু সময় পর পর চাচুর রুমের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছে সে। 

রাত্রে ফারজুর বাবা বাসায় এলে বাবাকে সব কিছু বললো ফারজু। মেয়ের কথা শুনে স্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করে সব কিছু শুনে অবাক হলেন তিনি। সেই থেকে মাঝে মাঝে রাত্রে তমালের বন্ধ দরজায় কান ঠেকিয়ে অনাকাংখিত কোনো কিছু শুনতে চেষ্টা করেন ফারজুর বাবা। কিন্তু কিছুই ধরা পড়েনা তার কাছে। ফুলের ঘ্রাণ ঠিকই অনুভব করেন তিনি। 

আজ যখন সকালের নাস্তা নিয়ে তমালের ঘরের দিকে এগুচ্ছিলেন তমালের ভাবী, তখন রুমের দরজা খোলাই ছিল। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পড়ার টেবিলে বসে কাগজ খাচ্ছে তমাল। ভাবীর পা আটকে গেলো মাটিতে। তিনি সামনে এগুবার সাহস পেলেন না। নাস্তা নিয়েই শ্বাশুড়ীর কাছে এসে ঘটনাটা বললেন। বউমার কথা বিশ্বাস হলো না তার। নিজ চোখে দেখার জন্য বউমার সাথে এলেন। অথচ তমাল তখন চুপ করে বসে আছে চেয়ারে। 

তমাল কি করছিস বাবা?’

বলতে বলতে ছেলের রুমে প্রবেশ করলেন মা। সাথে নাস্তাসহ তমালের ভাবীও। মায়ের প্রতি তাকিয়ে অদ্ভুত এক হাসি দিল তমাল। সেই হাসিতে রহস্য খুঁজে পেলেন তমালের ভাবী। হেসে হেসে তমাল বললো

কই, কিছু না তো মা? এমনি বসে আছি?’

ভয়ে ভয়ে টেবিলে নাস্তা নামিয়ে রেখে রান্না ঘরে চলে আসেন তমালের ভাবী। তিনি নিশ্চিত যে তমালকে জ্বীন পরী আছর করেছে। শ্বাশুড়ীকে রান্না ঘরে আসতে দেখে তিনি বললেন

মা, তমালকে ভালো একজন কবিরাজ দেখাতে হবে।

মা বললেন

ঠিক আছে। আরো কয়েক দিন দেখো। তার পর না হয় কবিরাজ দেখাবে। কিন্তু তুমি বললে ও কাগজ খাচ্ছে আমি তো দেখলাম না।’

আমি স্পষ্ট দেখেছি মা। আবার দেখলে আপনাকে দেখাবো।’

তমাল নাস্তা সেরে কিছু সময় পর বেরিয়ে গেলো। তমালের মা ভাবছেন, আসলেই ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে। সব সময় কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে, অথচ কিছু দিন পূর্বেও খুব হাসি খুশি ছিল, বাসায় থাকলে বাসাটা গরম করে রাখতো। ফারজুর সাথে দুষ্টুমি করতো। এখন বুঝাই যায় না তমাল বাসায় আছে। কি হলো ছেলেটার? বড় বউমার কথাই কি ঠিক? সত্যি কি ওকে জ্বীন পরীতে আছর করেছে? আরো কতো কিছু ভাবছিলেন তমালের মা। দুপুরে বড় ছেলে লাঞ্চে বাসায় এলো। ওর সাথে আলাপ করে একজন কবিরাজ দেখতে বললেন। 

তমাল রাতে বাসায় এলো। ওর চোখ লাল হয়ে আছে। মনে মনে ভয় পাচ্ছেন ভাবী। তমালের শরীর থেকে সুগন্ধী ফুলের ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। খাবার টেবিলে বসেছে তমাল। ওর মাও এসে ওর পাশে একটা চেয়ারে বসে ওকে দেখছিলেন। তমাল বললো

ভাবী, আজতো ষ্ট্রোবেরী লিচু খেয়ে এলাম। একটা আঙুর খেয়েছি। নাসপাতি খেয়েছি।’

 

ভাবী ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলেন

কে খাওয়ালো? এইতো! আসার সময় পথে একজন খাইয়েছে  , তা সেই মানুষটা কে?

ভাবীর প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলো তমাল। ভাতের প্লেট টেনে নিতে নিতে বললো

আগে ভাত দাও খেয়ে নেই।

খেতে শুরু করলো তমাল। প্রতি দিনের মতো আজও সে বসা থেকে উঠতে পারছে না। মা ও ভাবী দু’জনে ওকে ধরে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু পারা গেল না। ভাবীর রুমেই খাটের উপর শুয়ে পড়ল তমাল। ঠিক শুয়ে নয়, অজ্ঞান হয়ে গেল। প্রায় সাত আট মিনিট পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে আবার খেতে চাইল। খাবার যে খাবে তা ওর ভাবী পূর্ব থেকেই জানেন। আর তাই তো প্রতি রাত্রে ঐ পরিমাণ খাবার তিনি প্রস্তুত করে রাখেন। 

খাবার দেয়া হলো তমালকে। স্বাভাবিক ভাবে খেয়ে একা হেঁটে গিয়ে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। ভিতরে কি করে তা আর কেউ জানতে পারে না। 

আজ আকলিমা কবিরাজকে নিয়ে আসা হলো। সে নিজে কোনো কবিরাজী করে না। আগরবাতি মোমবাতি জ্বালিয়ে আসন করে বসে। তখন তার উপর জ্বীনের আছর হয়। আকলিমা কবিরাজের কণ্ঠস্বর বদলে যায়। পুরুষ কণ্ঠে কথা বলে জ্বীন। সেই জ্বীনকে ছোট বড় সবাই ডালিম মামা বলে সম্বোধন করে। এটা ডালিম মামাই শিখিয়ে দিয়েছেন। অন্য কোনো সম্বোধন করলে ডালিম মামা রাগ করেন। তাইতো তিনি সবার ডালিম মামা।

আকলিমা করিরাজ আসন করে বসলো। তার সামনে ছোট্ট একটা জলচৌকি। তাতে কয়েকটি মোমবাতি জ্বালিয়ে তার পাশে অনেক গুলো আগরবাতি জ্বালিয়ে দেয়া হলো। আগরবাতির ধুয়ার কু-লি উড়ছে। ঘ্রাণে মোহিত পুরো ঘর। আসন করে বসেছে আকলিমা কবিরাজ। পুরো ঘরে নীরবতা। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে আছে আকলিমা। সবার দৃষ্টি আকলিমার প্রতি। অনেক সময় পর চোখ মেলে তাকালো সে। তার চোখ দুটো লাল। ক্লান্ত ক্ষত্রিয়ের মতো ফুসফুস করছে আকলিমা। ইতোমধ্যে ডালিম মামা আকলিমার উপর আছর করেছেন। কিছু সময় ফুস ফুস চলতে থাকল। ভয়ে কারো কারো বুক ডিবডিব করছে। ফারজুর শরীরের লোম গুলো কাটা দিয়ে উঠেছে। মায়ের পাশে বসেছিল সে। ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আকলিমা কবিরাজের প্রতি চেয়ে আছে ফারজু। হঠাৎ করেই আকলিমা কবিরাজ কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু অবাক কা-! সে কথা বলছে পুরুষালী কণ্ঠে। তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে হয়নি। নিজে থেকেই বলতে শুরু করেছে

তমালকে পরী আছর করেছে। পরী ওকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়। খুব সহজে ছেড়ে যাবে না। আমি একটা তাবিজ দেবো, সেটা ওর গলায় পরিয়ে দিও। কাল আমার ভাগনীর কাছে থেকে তাবিজটা নিও তোমরা।

এর পর কিছু সময় নীরব। আবার চোখ বন্ধ হয়ে গেলো আকলিমা কবিরাজের। আজব কবিরাজ। এখন সে কথা বলছে মেয়েলি কণ্ঠে। কাল যেন তার কাছে থেকে তাবিজ নিয়ে আসা হয়। তা জানিয়ে বিদায় নিলো আকলিমা কবিরাজ। 

রাতে তমাল বাসায় ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমুতে গেল। আজ সে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ভোর বেলা আজ আর দরজায় কোনো টোকা পড়লো না। কোনো ফুলের মালাও পাওয়া গেলো না জানালার গ্রীলে। তবে তমালের রুম থেকে ফুলের ঘ্রাণ আসছে। বেলা দশটার উপরে হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে না তমাল। আজ তমালের কি হলো!

ভাবী কয়েক বার ডাকলেন। ফারজুও ‘চাচ্চু চাচ্চু, দরজা খোলো’ বলে দরজায় টোকা দিয়ে অনেক ডেকেছে। তমালের মা-ও ডেকেছেন বহুবার; কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। 

ফারজুরে বাবা, দুপুরে লাঞ্চ করতে এসে সব শুনে দরজা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে সেই আকলিমা কবিরাজের বাড়ি গিয়ে তাবিজ এনে, সেট সাথে রেখেই অফিস করেছেন। এখন সেই তাবিজটা ফারজুর মায়ের হাতে দিয়ে দরজা ভাঙ্গতে লেগেগেলেন। একটা সাবল এনে কয়েকবার চেষ্টার পর দরজা ভেঙে পড়ে গেলো। সাথে সাথে সুবাসিত ফুলের ঘ্রাণ উধাও। ভেতর থেকে ভেসে আসছে দুরগন্ধ। খাটের উপর পড়ে আছে তমালের লাশ। 

 

ইতিহাস জানার ব্যবস্থা করতেই স.....

নিজস্ব প্রতিবেদক

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, হোটেল নির্মাণ নয়, ইতিহাস জানার ব্যব.....

দ্বিতীয় ধাপে মুক্তিযোদ্ধার চ.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অংশ নেওয়া আরও ৬ হাজার ৯৮৮ জন বীর মুক্.....

করোনার চেয়েও ভয়ংকর এএমআর মোকা.....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক : অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা ওষুধের বিরুদ্ধে জীবাণুদের প্রতিরোধ .....

'মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মোঃ শাহাব উদ্দিন বলেছেন, সিভিএফ সভাপতি এবং প্রধানমন.....

ইফতার এবং সাহরীতে পানি সরবরাহ .....

নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র রমজান মাসে ইফতার এবং সাহরীর সময় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের জন্য ঢাকা ওয়াসাসহ দেশের .....

আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষ.....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন

বাংলা নববর্ষ ১৪২৮ উপলক্ষে আজ (১৩ এপ্রিল) মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দ.....

মামুনুলকে বহিষ্কারের কোন প্র.....

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম), প্রতিনিধি

মানুষকে রমজানে শান্তিপূর্ণভাবে রোজা রাখার সুযোগ দিতে হবে। মাহে রমজানে .....

চলে গেলেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক হ.....

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা : জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক প্রবীণ সা.....

এবার পহেলা বৈশাখ পালনে নিষেধা.....

ডেস্ক রিপোর্ট

করোনার সংক্রমণ উর্ধ্বমূখী হওয়ায় আগামী ১৪ এপ্রিল বাংলা বছরের প্রথম দিনটি জনসমাগম করে পালনে.....

ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে.....

নিজস্ব প্রতিবেদক : একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য লোকশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর মৃত্যুতে গভীর শ.....

দু’দিন পর স্বচল হলো গণপরিবহন .....

স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘোষিত লকডাউনে দু’দিন বন্ধ থাকার পর আজ আবারো শুরু হয়েছে গণপরিবহন চ.....

আরও বাড়তে পারে তাপমাত্রা .....

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক :

অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে বলে জ.....