নন্দীগ্রামে মাদকের শতাধিক স্পটে ইয়াবা কারবার, রাতে চলে জুয়া!


প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
নন্দীগ্রামে মাদকের শতাধিক স্পটে ইয়াবা কারবার, রাতে চলে জুয়া!

নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার নন্দীগ্রামে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনে চুরি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোর ও যুবকরা। উপজেলার শতাধিক স্পটে চলে মাদকের কারবার। এরমধ্যে পৌর এলাকায় রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক স্পট। মাদকদ্রব্য গাঁজা ও ফেনসিডিলের চেয়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কয়েকটি এলাকার বসতবাড়িতে রাতে বসে জুয়ার আসর। সেখানে গাঁজা, ইয়াবা ও চোলাই মদ বিক্রি ও সেবনের আখড়ায় পরিণত হয়।

সুত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে কৌশলী কারবারিরা শুধুমাত্র পরিচিত ব্যক্তির কাছেই মাদক বিক্রি করে। সড়কের পাশে এবং বাজারে তাৎক্ষনিক লোকেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মাদকাসক্তদের হাতে মাত্র ৫মিনিটের ব্যবধানে মাদকদ্রব্য পৌছেঁ দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য কিশোর বয়সীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা থেকে ঝরেপড়া কিশোর মাদকের আগ্রাসনে থাকায় তাদের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকরা।

কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা ইয়াবা কারবারিরা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। একাধিক মাদক মামলার আসামীরা স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের পদ বাগিয়ে নিয়েছে। তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দেয়ার জন্য দলীয় সাইনবোর্ড কাজে লাগাচ্ছে বলে সুত্র নিশ্চিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছায়া তদন্ত করলেই বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল, এমন মন্তব্য করেছেন মাদক বিরোধী সচেতন নাগরিকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক জানান, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের হাতেনাতে ধরতে ব্যর্থ হলে ঝামেলা হতে পারে। এরপরও অনেকেই নজরদারিতে রয়েছে। থানা পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযানে বেশকয়েকজন আইনের আওতায় এসেছে। তাঁদের মধ্যে মাদক সেবীর সংখ্যাই বেশি। মাদকের টাকার জন্য কিশোর ও যুবকেরা চুরি, চাঁদাবাজি, মারপিটসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে ১২মাসে মাদক সংক্রান্তে থানায় ১০১টি মামলা এবং ১৫টি চুরির মামলা হয়েছে। শীর্ষ মাদক কারবারি আইনের আওতায় এলেও তাঁরা জামিনে কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আবারো কৌশলে মাদকের ব্যবসা শুরু করেছে।

মাদক সেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকলে মাদকের টাকার জন্য ভাবতে হয় না। রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত হাজির হলেই লিডাররা মাদকদ্রব্য ব্যবস্থা করে দেয়। নানা অনুষ্ঠানের আড়ালে ঘরের মধ্যে গানবাজনা করে ইয়াবা সেবন ও দেশী-বিদেশী মদের আড্ডা চলে। পৌর এলাকায় অর্ধশতাধিক মাদকের স্পটের মধ্যে দুটি ফিলিং স্টেশন এলাকা নিরাপদ মনে করে কারবারিরা। কলেজপাড়া, ফোকপাল, ঢাকুইর ও দামগাড়া এলাকার অন্তত ২০জন ব্যক্তি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কৈগাড়ী মোড়, বাসস্ট্যান্ড, পুরাতন বাজার, হিন্দুপাড়া, পূর্বপাড়া, রহমাননগর, কচুগাড়ী, মাঝগ্রাম, নামুইট, ওমরপুর, গুন্দইল, বৈলগ্রাম ও কালিকাপুর এলাকায় মাদক কারবারির সংখ্যা বেড়েছে। কৌশলে মোটরসাইকেল ও অটোভ্যানে আসে মাদকের চালান। উপজেলার সিমলা বাজার, মির্জাপুর দামগাড়া, ভাগবজর, মনিনাগ, রামকৃষ্ণপুর চৌদিঘী, পন্ডিতপুকুর, কুন্দারহাট, ভাটগ্রাম, নিনগ্রাম, রুপিহার, খেংশহর, সিংজানী, কামুল্যা, আইলপুনিয়া, কাথম, তেঘরি, ভদ্রদীঘি, কহুলী, বুড়ইল, দাসগ্রাম, বীরপলী, বাংলা বাজার, মুরাদপুর, পেংহাজারকি, ধুন্দার বাজার, হাঁটুয়া, রণবাঘা, ভাদুম, ডেরাহার, গুছইন, বিজরুল, বর্ষণ, চাকলমা, কল্যাণনগর, হাটকড়ই, দামরুল, গুলিয়া, ত্রিমহনী, চৌমহনীসহ অন্তত ৯০টি স্পটে মাদকের কারবার চলে। তবে সেবনকারীরা অপরিচিত হলে তাঁরা স্বীকার করে না, বিক্রিতেও রাজি হয় না। পরিচিত হলেও কৌশলে তাৎক্ষনিক লোকেশনে কিশোরদের মাধ্যমে মাদক পৌঁছে দেয়। এ কাজে ব্যবহার করে মোটরসাইকেল। ট্রাক চালকদের মধ্যে গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যা বেশি। কেউ কেউ কথিত শ্রমিক সংগঠনের আড়ালে ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তি পরিচালিত বিভিন্ন সংগঠনের অফিস, কলেজপাড়া, উপজেলার বিজয়ঘট, সিধইল সুখানগাড়ী, হাটকড়ই, পৌরসভার দামগাড়াসহ অন্তত ৮টি এলাকায় অঘোষিত স্থানে বসতবাড়িতে সপ্তাহে দু’দিন রাতের বেলায় জুয়া ও মাদকের হাট বসে।

বিভিন্ন মহলকে নিয়মিত বখরা দিয়ে ম্যানেজ করায় এবং জুয়াড়িরা কৌশলী হওয়ার কারণে পুলিশ অভিযান চালানোর পূর্বেই তারা সতর্ক হয়ে যায় বলেও সুত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে নন্দীগ্রাম থানার ওসি আজমগীর হোসাইন আজম বলেন, মাদক ও জুয়ার সঙ্গে কোনো আপস নেই। সিন্ডিকেটের নেপথ্যে যেই থাকুক, রাজনৈতিক নেতা হলেও ছাড় দেওয়া হবে না।