কুষ্টিয়াবিএনপিরাজনীতিসারা বাংলা

বেগম খালেদা জিয়া: একটি যুগের অবসান, ইতিহাসের নীরব প্রস্থান

হাফেজ মঈনউদ্দিন: বাংলাদেশ আজ গভীর শোকের মধ্য দিয়ে একটি ইতিহাসের ভার বহন করছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান নয়; এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি, একটি সময়ের ইতি টানা—যেখানে ভালোবাসা ও বিরোধিতা, দুটোই ছিল সমান তীব্র। রাজনীতির মাঠে যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে আবেগ, সংঘাত, আশা ও হতাশা—তাঁর চলে যাওয়া মানে ইতিহাসের একটি অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই মৃত্যু সংবাদ আজ বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসে শুধু শোকই নয়, রেখে গেছে অগণিত প্রশ্ন, স্মৃতি ও মূল্যায়নের ভার।

বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এই পরিচয়ই তাঁকে ইতিহাসে অনন্য করে তোলে। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে তিনি কেবল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হননি, বরং দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর আগমন হলেও খুব দ্রুতই তিনি নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হন। স্বামীর হত্যার পর শোক, অনিশ্চয়তা ও ষড়যন্ত্রের আবহে তিনি যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা সহজ ছিল না। সেই সময়ে অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি সাময়িক একটি অধ্যায় মাত্র, কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে—তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক শক্ত স্তম্ভ।

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব জাতির সামনে নতুন আশার দুয়ার খুলে দেয়। সামরিক শাসনের পর জনগণ যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল, তার বাস্তব রূপ দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলে সংসদ কার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে প্রাণ পায়। একই সঙ্গে তাঁর সরকার নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তীব্র সংঘাত, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজপথের উত্তাপ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সময়কাল কখনোই নির্বিঘ্ন ছিল না।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই বিতর্কের মধ্য দিয়ে পথচলা। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী, গণতন্ত্রের প্রতীক; অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর ও প্রশ্নবিদ্ধ শাসনের প্রতিনিধিত্বকারী। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—তিনি রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন, আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং জনগণের আবেগকে স্পর্শ করতে পেরেছেন। বহু মানুষ তাঁর ডাকে রাজপথে নেমেছে, আবার বহু মানুষ তাঁর বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই তাঁকে করে তুলেছে বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়ে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষা বিস্তার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়ার নীতির মাধ্যমে তাঁর সরকার অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে তাঁর সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, অবিশ্বাস ও সংঘাত রাষ্ট্রকে বহুবার অস্থির করেছে। এসব সাফল্য ও ব্যর্থতার মিশ্রণেই গঠিত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে রাজনীতির সক্রিয় মঞ্চ থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দেয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকেও তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি রাজনৈতিক প্রতীক। তাঁর অসুস্থতা যেমন সহানুভূতির জন্ম দিয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। শেষ পর্যন্ত যখন তাঁর জীবনাবসান ঘটে, তখন সমর্থক ও বিরোধী নির্বিশেষে সবাই উপলব্ধি করে—একটি অধ্যায় সত্যিই শেষ হয়ে গেল।

আজ তাঁর মৃত্যুর পর রাজনীতি যেন কিছুটা নীরব। রাজপথ, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই শোকের আবহ। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন মায়ের মতো, নেত্রীর মতো; আবার অনেকের কাছে কঠোর প্রতিপক্ষ। কিন্তু মৃত্যুর সামনে এসে সব বিভাজন ম্লান হয়ে যায়। ইতিহাস তখন মানুষকে আর দল দিয়ে বিচার করে না; বিচার করে অবদান, প্রভাব ও সময়কে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপি যেমন একটি শূন্যতার মুখে, তেমনি জাতীয় রাজনীতিও এক ধরনের ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রবেশ করেছে। যাঁকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন রাজনীতির বহু সমীকরণ আবর্তিত হয়েছে, তিনি নেই—এটি সহজ সত্য হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ভবিষ্যৎ রাজনীতি এখন নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা ও নতুন দায়িত্বের দিকে এগোবে, কিন্তু অতীতের এই অধ্যায়কে উপেক্ষা করে নয়।

ইতিহাস বেগম খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে—সে প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সময়ই দেবে। হয়তো তাঁকে মনে রাখা হবে একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে, হয়তো বিতর্কিত শাসনের প্রতীক হিসেবে, আবার হয়তো একজন নারী নেত্রী হিসেবে—যিনি পুরুষশাসিত রাজনীতিতে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিনি ইতিহাসের পাতায় ছোট করে লেখা কোনো নাম নন। তিনি একটি পূর্ণ অধ্যায়, যাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা অসম্ভব।

আজ তাঁর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, জীবন অনিশ্চিত; কিন্তু ইতিহাস নির্মাণের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর নাম, তাঁর সময় এবং তাঁর প্রভাব রয়ে যাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে। শোকের এই দিনে জাতি একজন নেত্রীকে বিদায় জানায়, আর ইতিহাস আরেকটি অধ্যায় সংরক্ষণ করে রাখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *