
লাখোকন্ঠ রাজনীতি ডেস্ক: মঞ্চে উঠলে যেন মুখে ফুটত খই, রীতিমতো বাকপটু। খেলা হবে! এমন বুলিতে যিনি হুংকার ছাড়তেন, তিনি শামীম ওসমান। তাঁর এই ‘খেলা হবে’ কথন পাশের দেশ ভারতের কলকাতাও লুফে নেয়। আওয়ামী লীগ আমলের পুরোটা সময় চলেছেন ডাঁটে-বাঁটে। সন্ত্রাস আর পেশির জোরে রাজত্ব করেছেন প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে। রাজনৈতিক ছায়ায় বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে পুরো নগরী রেখেছিলেন হাতের মুঠোয়। প্রকাশ্যে অস্ত্রসহ ২০-২৫টি গাড়ি নিয়ে মহড়া দেওয়া ছিল তাঁর নিত্যকাজ। আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের আশকারায় শামীম ওসমান ছিলেন এলাকার ‘গডফাদার’। তাঁর প্রতাপে মানুষ ছিল ভয়াতুর।
কথিত আছে, নারায়ণগঞ্জে টাকা ওড়ে! নগরীর টাকার উৎস হাজার হাজার কলকারখানা। সেই টাকা ধরতে জানতেন শামীম ওসমান। এ কারণে সম্পদে ফুলে-ফেঁপেছেন। ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। বহু গুম-খুনের খলনায়ক তিনি। বিশেষ করে সাত খুন ও ত্বকী হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে। তাঁর অঙ্গুলি হেলনে চলত দরপত্রবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনীতিবিদ ঘায়েল। কটাক্ষ, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে রাখাসহ নানা কুকীর্তিতে শামীম ছিলেন দশে দশ! তাঁর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ‘খেলা হবে’ বলেও ‘খেলা ফেলে’ তিন-তিনবার দেশ ছেড়ে পালান তিনি। একবার ২০০১ সালে, দ্বিতীয়বার ২০০৭ সালে, শেষবার ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর। এখন শামীম ওসমানহীন নগরে বইছে স্বস্তি; মানুষের মুখে মুখে তাঁর কুকর্মের আলাপন।
শামীমের জোয়ার-ভাটা:
গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়াটা ছিল তাঁর বেশ পছন্দের। দোর্দণ্ড প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্য (এমপি) গত সাড়ে ১৫ বছর নানাভাবে ছিলেন আলোচনায়। ২০০১ সালের নির্বাচনে ধুন্ধুমার কারচুপি করেও প্রভাবশালী এই নেতা নৌকা তীরে ভেড়াতে পারেননি। জোটপ্রার্থী গিয়াসউদ্দিনের কাছে ভোটে হেরে রাতের আঁধারে বোরকা পরে পালান শামীম ওসমান। একপর্যায়ে কানাডায় গিয়ে সেখান থেকে নিজের ক্যাডার বাহিনীকে নারায়ণগঞ্জে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌর নির্বাচনে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সমর্থন দেন তিনি। সে সময় আইভীকে জেতাতে কানাডা থেকে নিজের নেতাকর্মীকে নির্দেশ দেন। শামীম ওসমানের চেষ্টা এবং আইভীর বাবা আলী আহম্মদ চুনকার ইমেজের কারণে আইভী নারায়ণগঞ্জের প্রথম নারী পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন কানাডায় পালিয়ে থাকার পর ২০০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে ফেরেন শামীম। শহরে ফিরেই শোডাউন করে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দেন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বাতিল হওয়া নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে মহাজোটের মনোনয়নও পেয়ে যান এই ‘গডফাদার’। বিধিবাম! ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে ফের পালান তিনি। পলাতক অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলায় সাত বছরের সাজা হয়। আইনি জটিলতার কারণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের টিকিট থেকে বঞ্চিত হন আলোচিত এ রাজনীতিবিদ। সে সময় শামীম ওসমানের চাচি চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন পান। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পান তাঁর আপন বড় ভাই জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসিম ওসমান। কবরী ও নাসিম ওসমান দু’জনই সে নির্বাচনে জয়ী হন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালের এপ্রিলে ফিরে নারায়ণগঞ্জে আবারও গাঁড়েন সন্ত্রাসের খুঁটি। সেই থেকে ফের শুরু হয় ‘ওসমানীয় আমল’।
২০১১ সালে সিটি নির্বাচনে তিনি আইভীর কাছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৪৩ ভোটে হেরে যান। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিট পান শামীম। এর পর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। এবারের গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি বুঝে নারায়ণগঞ্জ থেকে শামীম ওসমান আরে কদফা হাওয়া হয়ে যান।
হলফনামায় সম্পদ:
দশম সংসদ নির্বাচনের সময় শামীম ওসমানের জমা দেওয়া হলফনামার সঙ্গে দ্বাদশ সংসদের ভোটের হলফনামা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১০ বছরে তাঁর অস্থাবর সম্পত্তি তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। যা আগে ছিল ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ৭৩ হাজার টাকা। এ সময়ে শামীম সাড়ে ১২ গুণের বেশি কৃষিজমির মালিক বনে যান। হয়েছেন পূর্বাচলে রাজউকের ১০ কাঠার প্লট আর দুটি টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ির মালিক। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল স্ত্রীর সম্পদও।
দশম সংসদ নির্বাচনে শামীম স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে নিজের নামে ১০ শতাংশ কৃষিজমি, ১৬ শতাংশ জমির ওপর ৭৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের দোতলা আবাসিক বাড়ি, উত্তরায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ৯ কাঠার জমি দেখিয়েছিলেন। তাঁর নিজের নামে ছিল ১০ তোলা সোনা।
২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে শামীম তাঁর নিজের নামে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের ১২৩ শতাংশ কৃষিজমি, ১০ শতাংশ অকৃষিজমি, যার মূল্য ৫ হাজার ৭৫০ টাকা, ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের পূর্বাচল রাজউক নিউ টাউনে ১০ কাঠার প্লট এবং ১৬ শতাংশ জমির ওপর ৭৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের দোতলা আবাসিক বাড়ি দেখান। এ সময় পর্যন্ত সোয়া ১২ গুণের বেশি কৃষিজমির মালিক হয়েছেন। তবে এসব স্থাবর সম্পত্তির মূল্য ২০১৪ সাল থেকে ২ শতাংশ কম দেখিয়েছেন।
১০ বছর আগে শামীমের নামে কোনো গাড়ি ছিল না। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় নিজের নামে দুটি গাড়ি দেখিয়েছেন তিনি। একটি ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা মূল্যের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮ গাড়ি, অন্যটি ৮১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দামের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার। এ ছাড়া একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল দেখিয়েছেন। নিজের নামে ৩৮ তোলা সোনাসহ ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার এফডিআরসহ ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পত্তি দেখিয়েছিলেন।
আপনার মতামত লিখুন :