
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকা তৈরির সময় সরেজমিনে গিয়ে আবেদনকারীর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার মিল আছে কিনা তা না দেখেই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। ফলে যাদের বাড়িতে আগে থেকেই একাধিক নলকূপ আছে, যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাদের নামও তালিকায় উঠে যাচ্ছে।
অন্যদিকে দিনমজুর, কৃষক, বিধবা নারীসহ অসংখ্য হতদরিদ্র পরিবার বারবার আবেদন করেও খালি হাতে ফিরছেন। কমলগঞ্জের একজন দিনমজুর ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, তিনি তিনবার আবেদন করেও নলকূপ পাননি, অথচ তার প্রতিবেশী যার বাড়িতে আগে থেকেই দুটি নলকূপ আছে তিনি ঠিকই পেয়ে গেছেন। রাজনগরের একজন কৃষক বলেন, তালিকা করার সময় কেউ তাদের বাড়িতে এসে অবস্থা দেখেননি, খাতায়-কলমেই তালিকা হয়ে গেছে। শ্রীমঙ্গলের একজন বিধবা গৃহিণী জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলে-মেয়ে নিয়ে পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়, আবেদন করেও তিনি সুবিধা পাননি, অথচ তার চেয়ে ভালো অবস্থার মানুষ পেয়েছে শুনে তিনি খুব কষ্ট পেয়েছেন।
এই অনিয়ম নিয়ে জেলার শিক্ষক, ব্যবসায়ী, যুবক, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ধর্মীয় নেতারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মৌলভীবাজার সদরের একজন স্কুল শিক্ষক বলেন, একটি সরকারি সুবিধা যখন সঠিক লোকের কাছে পৌঁছায় না তখন সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, তাই কে পেল আর কেন পেল সেই তথ্য ইউনিয়ন পরিষদে প্রকাশ্যে টানিয়ে দেওয়া উচিত। কুলাউড়ার একজন সচেতন যুবক বলেন, তালিকায় অনেক সময় পরিচিত মুখ আর আত্মীয়-স্বজনদের নাম আগে আসে, দলীয় পরিচয় বা তদবির যাদের আছে তারাই সুবিধা পায়, এটা বন্ধ না হলে গরিব মানুষ কোনোদিনই সুবিধা পাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউপি সদস্য বলেন, তারা গ্রাম থেকে নাম পাঠালেও উপরে গিয়ে অনেক সময় তালিকা বদলে যায়, অফিস থেকে মাঠ পর্যায়ে ঠিকমতো যাচাই করা হলে এই অভিযোগ উঠতো না। বড়লেখার একজন প্রবীণ ইমাম বলেন, সরকারের জিনিস আমানত, এই আমানত সঠিক জায়গায় না পৌঁছালে মানুষের হক নষ্ট হয়, তিনি কারো শাস্তি চান না, চান গরিব মানুষটা যেন তার হকটা পায় আর কর্মকর্তারা নিজে মাঠে গিয়ে দেখেন। জুড়ীর একজন ব্যবসায়ী বলেন, তার নিজের নলকূপ থাকায় তার দরকার নেই, কিন্তু তার এলাকায় যারা সত্যিকারের গরিব তারা পায়নি দেখে তার খারাপ লাগে, সরকারের টাকায় যদি সঠিক লোক উপকার না পায় তাহলে উন্নয়ন হবে কিভাবে।
সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের এই ক্ষোভ এখন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তাদের দাবি, বিগত কয়েক অর্থবছরের বরাদ্দকৃত গভীর নলকূপের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে হবে, প্রতিটি ইউনিয়নে কারা পেয়েছেন এবং কোন মানদণ্ডে পেয়েছেন তা স্বচ্ছভাবে যাচাই করতে হবে, প্রকৃত হতদরিদ্র যাদের নলকূপ নেই তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন তালিকা করতে হবে এবং তালিকা যাচাইয়ে কোনো গাফিলতি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে, তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে আনবে এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনো দরিদ্র পরিবার আর বঞ্চিত না হয় সেই ব্যবস্থা নেবে, যাতে সরকারের এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসে।