এনসিপিতে নারী নেতৃত্বের বিদ্রোহ, একের পর এক পদত্যাগ


প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
এনসিপিতে নারী নেতৃত্বের বিদ্রোহ, একের পর এক পদত্যাগ

লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্কঃ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রতিবাদে এরই মধ্যে দল ছেড়েছেন দুই প্রভাবশালী নারী নেত্রী, আর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন আরও কয়েকজন। এই ঘটনাকে দলটির জন্য একটি বড় ‘ধাক্কা’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দলের অন্যতম আলোচিত মুখ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা গত শনিবার রাতে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার পরপরই গতকাল পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তাজনূভা ঢাকা-১৭ আসন থেকে দলের প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও তিনি আর নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দল না ছাড়লেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তিনি এই জোটের সিদ্ধান্তকে ‘জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থী হতে ইচ্ছুক যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনকালীন সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। বিদ্রোহী নেত্রীদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করা এনসিপির মূল আদর্শের পরিপন্থী। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন এই সমঝোতাকে ‘আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “কিছু আসনের বিনিময়ে দলের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হওয়া হয়েছে।”

পদত্যাগকারী ও বিক্ষুব্ধ নেতাদের আপত্তির মূল জায়গাগুলো হলো: ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা ও গণহত্যার বিষয়টি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নারীদের অবস্থান: জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের পক্ষ থেকে এনসিপির নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে অনলাইনে চরিত্র হননের চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়েছে। নেত্রীদের আশঙ্কা, জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতারণার অভিযোগ: এনসিপি শুরুতে এককভাবে ৩০০ আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করায় তৃণমূল নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়েছেন।

গত শনিবার এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে একটি চিঠি দেন দলের ৩০ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা। সেখানে তারা স্পষ্টভাবে জানান, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে তারা একযোগে পদত্যাগ করবেন। তারা প্রয়োজনে বিএনপির সঙ্গে জোট করা বা এককভাবে নির্বাচনের জন্য নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও জামায়াতসহ ১০ দলের জোটে থাকার সিদ্ধান্তে অটল এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাহী পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেউ নির্বাচনে থাকা বা না থাকার বিষয়টি একান্তই তার ব্যক্তিগত। যারা পদত্যাগ করেছেন বা অসন্তুষ্ট, তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব এবং আশা করি তারা পুনরায় দলের সঙ্গে ফিরবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা মনে করেন, এনসিপি গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আগেই এভাবে গুরুত্বপূর্ণ নারী নেত্রীদের প্রস্থান নবীন এই দলটির জনমত ও গ্রহণযোগ্যতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।