হামলার শিকার চিকিৎসক আসাদুর: চাঁদা চাওয়া হয়েছিল ‘ডেভিড ইমনের নামে’


লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫৬ অপরাহ্ণ ৮৯
হামলার শিকার চিকিৎসক আসাদুর: চাঁদা চাওয়া হয়েছিল ‘ডেভিড ইমনের নামে’

চিকিৎসক আসাদুর রহমান বলছেন, চাঁদার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তার দুদিন পর হামলার শিকার হন। এর ঘণ্টাখানেক পর বার্তা আসে ‘হাউ ডু ইউ ফিল’। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ১১ দিন আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমনের নামে’ চাঁদা চেয়ে তার কাছে বার্তা এসেছিল; সেই টাকা পরিশোধে সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

ওই সময়সীমার দুদিন পর অতর্কিত হামলার শিকার হন তিনি। এর ঘণ্টাখানেক পরেই একই নম্বর থেকে বার্তা আসে ‘হাউ ডু ইউ ফিল’।

হাসপাতালে ভর্তি এ চিকিৎসক বলছেন, বার্তার নিচে লেখা ছিল ডেভিড ইমনের নাম, যিনি গত ২৭ জুলাই ভারতে পালানোর সময় যশোর সীমান্তে গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে রয়েছেন কারাগারে।

ফলে ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদা দাবি ও আক্রমণ চালিয়েছে কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত নাহলেও তদন্ত করছে পুলিশ।

গত ১৭ অগাস্ট রাজধানীর শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেম্বার থেকে বের হয়ে অটোরিকশায় ওঠার পর রাত ১১টার দিকে হামলার শিকার হন ৫৫ বছর বয়সি চিকিৎসক আসাদুর রহমান।

তার মাথায়, মুখে, চোখে আঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।

তার ডান চোখটি লাল হয়ে ফুলে আছে। তিনি কিছুটা আতঙ্কিতও, বলছেন স্বজনেরা। হামলার ওই ঘটনা নিয়ে বুধবার কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন এই অধ্যাপক।

হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে সন্দেহ করে তিনি বলেন, গত ৬ অগাস্ট বার্তা পাঠিয়ে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা চাওয়া হয়। টাকা দিতে বলা হয়েছিল ১৫ অগাস্টের মধ্যে।

“শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্বই দিইনি। বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কোনো ভুয়া গ্রুপ হতে পারে। কিন্তু দেখা গেল, ১৫ তারিখ সময় দেওয়ার পর তারা ১৭ তারিখে এসেই হামলা করল।”

হামলার ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “চেম্বার শেষ করে সিএনজিতে ওঠার পর সেটা ৮/১০ হাত সামনে এগোনোর পর তারা পথ আটকাল। তারা দরজা খুলতে বলছিল। আমি ড্রাইভারকে মানা করতেছি যে ‘দরজা খুইলো না’। আমি তাদের (হামলাকারী) জিজ্ঞেস করতেছি যে তোমরা কী চাও, তোমাদের সমস্যা কী? তখন একজন বলতেছে, ‘তুই অমুকের বোনরে ভুল চিকিৎসা করছস। তুই দরজা খোল’।

“আমি বললাম, ‘কার বোন, সেই রোগীটা কোথায়’। তখন তারা কিছু বলে না, শুধু বলে ‘দরজা খোল আগে’। আমার মানা না শুনে দরজা খুলে দিল ড্রাইভার। তখন তারা মাইর শুরু করল।”

ঘটনাস্থল থেকে আশেপাশের লোকজন হামলাকারীদের একজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “পরে পুলিশ তাকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেছে, তখন সে রোগী সম্পর্কিত কোনো বিষয় কিছুই বলতে পারতেছে না। পুলিশ তাকে নিয়ে বাইরে গেছে যে কোন রোগী, কোথায় থাকে, সে তখন কিছু বলতে পারছে না।

“এরপর সে পুলিশকে বলছে যে, কেউ একজন তাকে বলেছে ‘এই ডাক্তার সাহেবের অনেক টাকা আছে। তার কাছে আমরা যাব, তুই আমাদের সাথে চল, তোকে একটা মোবাইল কিনে দিব’। এ জন্য সে আসছে।”

অধ্যাপক আসাদুর বলেন, “এগুলো সব আমার শোনা কথা। ঘটনা অন্যরকমও হতে পারে।”

মারধরের পর একই নম্বর থেকে তাকে আবারও বার্তা পাঠানো হয়।

আসাদুর রহমান বলেন, “আহত করার ঘণ্টাখানেক পরে মেসেজ পাঠাইছে ‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’। এর পরদিন মেসেজ পাঠাইছে, ‘তুমি কি আরও ঝামেলা করতে চাও?’ তারপরে মেসেজ পাঠাইছে, ‘তোমার কাছে কি আমরা মিডিয়ার লোকজন পাঠাব?”

হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেছেন এ চিকিৎসক। এজাহারে তিনি ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তবে এজাহারে ডেভিড ইমনের নাম বা হামলার পরে বার্তা পাঠানোর বিষয়টি নেই।

চিকিৎসকের ওপর হামলার পর হাসপাতালে তার রক্তাক্ত অবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে চিকিৎসকদের গ্রুপগুলোতে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী বলেন, “পরশু দিন (১৭ অগাস্ট) ঘটনাটা ঘটেছে। চারজন পথরোধ করে তার ওপর হামলা করেছে বলে এজাহারে বলা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকেই হাতেনাতে একজনকে ধরা হয়েছে। এই লোকটাকে এখন পুলিশ রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকি বিষয়গুলো উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।”

এডিসি মেহেদি বলেন, “এজাহারে একটা নম্বর থেকে হুমকির অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ এসব খতিয়ে দেখছে কারা এই হুমকি দিচ্ছিল।”

হামলাকারী সম্পর্কে পুলিশের ধারণার ব্যাপারের প্রশ্ন করলে এ কর্মকর্তা বলেন, “প্রাথমিক ধারণা করার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু হাতেনাতে একজনকে ধরা হয়েছে, তার সূত্র ধরে সেটা ধীরে ধীরে উন্মোচন হবে।”

চাঁদা দাবির পেছনে ডেভিড ইমন?

ডেভিড ইমনের নামে চাঁদার বার্তা পাঠানো হলেও তিনি তো কারাগারে। আদতে তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটাও নিশ্চিত নয় পুলিশ।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ বলেন, “হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জীবন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদা দাবি বা নেপথ্যে কারা আছে এসবই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। চব্বিশের পট পরিবর্তনের পর সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজির মধ্য দিয়ে কুখ্যাতি পাওয়া ইমন গত ২৭ জুলাই রাতে ভারতে যাওয়ার চেষ্টার সময় যশোর সীমান্ত এলাকায় গ্রেপ্তার হন।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইমন বিদেশে পালিয়ে থাকা চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী।

একসময় ডেভিড ইমন রাউজান এলাকায় বালুর মহালে টাকা তুলতেন। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী রায়হানের হাত ধরে আলোচনায় আসেন তিনি।

এক বছরের মধ্যেই জোড়া খুনসহ বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের শীর্ষে চলে আসে ইমনের নাম।

গত ১৩ জুলাই তিনি বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন) নামে একটি ইন্টারনেট সেবার কোম্পানির মালিককে ফোন করে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় ওই কোম্পানির অফিসে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।

এর আগে গত জানুয়ারিতে সাবেক এমপি ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান চৌধুরীরর বাসায় গুলির ঘটনাতেও ইমনের নাম আসে।

এছাড়া গত বছরের ৩০ মার্চ চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মুখে প্রাইভেট কারে গুলি করে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে খুন, ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের ঘটনাতেও আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১