আবরার ফাহাদ হ’ত্যার ৭ বছর: চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় পরিবার

✎ সামরুজ্জামান (সামুন)
প্রকাশিত হয়েছে: ৭ অক্টোবর, ২০২৬

সামরুজ্জামান (সামুন), কুষ্টিয়া

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ৭ বছর আজ। এ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়। হাইকোর্টও সেই সাজা বহাল রাখেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। আপিল বিভাগে আসামিদের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।

এদিকে গত সাত বছর ধরে বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আবরার ফাহাদের পরিবার বলছে, একের পর এক আদালতের রায় এলেও তাদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। রায় কার্যকরের অগ্রগতি নিয়ে তারা এখন হতাশ। আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ জানান, তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও নাড়া দিয়েছিল। তার দাবি, আবরার হত্যার পর মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনে তার প্রভাব ছিল। ফ্যাসিবাদ বিদায়ের সূত্রপাত হয়েছিল আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। কিন্তু যাদের কারণে আজ পরিবর্তন এসেছে, সেই হত্যার বিচারই এখনো শেষ হয়নি। ফাইয়াজ বলেন, ‘২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্টের রায়ের পরও তারা অপেক্ষা করছেন। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করলেও তাদের বলা হয়, মামলা সিরিয়াল অনুযায়ী এগোয়।’ ‘সিরিয়াল এগিয়ে আনা যায়। কিন্তু তারা সিরিয়াল এগিয়ে আনতেও দ্বিধাবোধ করে। আমরা যেখানে যেখানে যোগাযোগ করার দরকার, করেছি। এখন অপেক্ষা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই’, বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘রায় কার্যকর করতে বাধা কোথায়, সেটা আমাদের পরিবারের জানা নেই। এখন মনে হচ্ছে এগুলো অবহেলা ছাড়া আর কিছুই না।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির সদস্যসচিব সুলতান মাহমুদ তালহা বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা হয় আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। সেই ফ্যাসিবাদ দূর হয়েছে। নতুন সরকার এসেছে। তাদের উচিত আবরার ফাহাদের হত্যায় জড়িত আসামিদের রায় দ্রুত কার্যকর করা। আর এই দাবি শুধু আমার নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের দাবি। আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবরার হত্যা মামলাটির গুরুত্বও কমে গেছে। আবরার ফাহাদের আসামিদের রায় কার্যকর শুধু আমার পরিবারের চাওয়া নয়, এটা সারা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া। তারপরও রায় কার্যকর হচ্ছে না। এতে শুধু আমি নই, দেশের সবাই হতাশ’, বলেন তিনি। এ সময় তিনি সরকারের কাছে বিচারকার্য দ্রুত শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্যায্য চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আবরার। পরদিন রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। পরদিন হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আবরার ছিলেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি, আবাসিক হলে নির্যাতন এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

পরে আবরারের বাবা বাদী হয়ে চকবাজার থানায় হত্যামামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
দুই বছরের বেশি সময় পর বিচার শেষে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও ওই রায় বহাল রাখেন।কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি মামলা। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কয়েকজন আসামি আপিল বিভাগে আবেদন করেন। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। সেই সঙ্গে আবরারের পরিবারও অপেক্ষায় রয়েছে কবে তারা চূড়ান্ত রায় ও সাজা কার্যকর দেখতে পারবে।

এদিকে আবরার ফাহাদ এর স্মরণে কুষ্টিয়া কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গায় আবরার ফাহাদ এর গ্রামে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফীলের আয়োজন করা হয়েছে। কুষ্টিয়াবাসীরও দাবী আবরার ফাহাদ এর রায়ের কার্যকর যেন দ্রুত সম্পন্ন হয়।

ই-প্রিন্ট