জামিনের পরও কারাগারে, ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ নিয়ে প্রশ্ন

✎ বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
প্রকাশিত হয়েছে: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি না পাওয়া কিংবা কারাফটক থেকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এ ধরনের পদক্ষেপের বৈধতা ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আহসান আহমেদ (ছদ্মনাম)। তার বিরুদ্ধে থাকা দুটি মামলায় প্রায় ছয় মাস পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান তিনি। কিন্তু কারাগার থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির সময় জানতে পারেন, অন্য একটি থানায় করা নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আহসানের ভাষ্য, এরপর আরও দুই দফায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও প্রতিবারই নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত পঞ্চমবারের চেষ্টায় মুক্তি পান তিনি। ততদিনে কেটে যায় প্রায় দেড় বছর।

আহসান বলেন, একবার কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে আটক করেন। পরে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে নেওয়া হয়।

শ্যোন অ্যারেস্ট নিয়ে আইনে কী আছে?

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(এ) ধারায় কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করা, সংশ্লিষ্ট মামলার কেস ডায়েরি উপস্থাপন এবং আসামিপক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার বিষয় রয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহজাহানের মতে, জামিন পাওয়ার পর কাউকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য, জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার না থাকলে তাকে মুক্তি দিতে হবে।

তবে তিনি বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রতিরোধমূলক আটক একটি পৃথক বিষয়।

নতুন মামলায় আটকের অভিযোগ

কুষ্টিয়ার একটি ঘটনায় ওয়াসিম আকরাম অভিযোগ করেছেন, তাঁর বাবা করিম প্রামাণিকসহ আটজন একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে নতুন একটি নাশকতার মামলা করা হয়। তাঁর দাবি, জামিনের পর কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই তাদের আটক করে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তবে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জাকির হোসেন কারাগারের ভেতর থেকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মামলার এজাহারে যেভাবে ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিই প্রযোজ্য।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. শরিফুল আলম বলেন, আটজনকে কারাগারের ভেতর থেকে নেওয়া হয়নি; তাদের কারাফটক দিয়ে বের করে দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিয়ে যায়।

ফলে আসামিদের ঠিক কোথা থেকে এবং কীভাবে আটক করা হয়েছিল, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের বক্তব্য

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অ্যাটর্নি জেনারেলও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য নেই। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।

আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জামিনের পর কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় আটক বা গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে অনুসরণ করা জরুরি। আর সেই প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও মামলার কেস ডায়েরিই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ই-প্রিন্ট