
সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ—আর সেই অভিযোগকে ঘিরেই একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়েছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার সহকারী প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মো. আবু সাঈদ আকন্দ। তাঁর দাবি, পারিবারিকভাবে দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় থাকলেও একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। এমনকি সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় তোলা ছবি ব্যবহার করেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। শুধু প্রচারণাই নয়, চাকরিতে প্রবেশের সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করছেন এই প্রকৌশলী। তাঁর ভাষ্য, পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে সক্রিয় থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি মহল আরও সক্রিয় হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি দায়িত্ব পালনের প্রমাণ হিসেবে থাকা ছবি কিংবা পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় কি কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে?
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু সাঈদ আকন্দের পারিবারিক রাজনীতির ইতিহাস বেশ পুরোনো বলে দাবি করেছেন তাঁর স্বজন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা মরহুম ফজলুল হক আকন্দ ছিলেন স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নির্বাচিত গ্রাম সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি চর আমখাওয়া ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠকদের একজন ছিলেন।
স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেছেন ফজলুল হক আকন্দ। ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি থাকার পাশাপাশি ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন বলে স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য।
পরিবারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তালিকায় রয়েছেন আরও কয়েকজন। আবু সাঈদ আকন্দের বড় বোন মোছা. হাসনা হেনা ইউনিয়ন মহিলা দলের সাবেক সহসভাপতি এবং বর্তমানে সভাপতি পদপ্রার্থী। তাঁর চাচা নূর মোহাম্মদ জাহিদ ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি। আরেক চাচা আব্দুল জলিল আজাদ চর আমখাওয়া ইউনিয়ন যুবদলের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। তাঁর ভাগিনা কামরুল হাসান জুয়েল যুবদলের ৯ নম্বর ওয়ার্ড শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্বজনদের দাবি, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে পরিবারটিকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিগত ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল বলে তাঁদের বক্তব্য। ওই সময়ে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আবু সাঈদ আকন্দের বাবা ও চাচাদের অনেক রাত বাড়ির বাইরে কাটাতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা।
সরকারি চাকরির শুরুতেই বাধার অভিযোগ
পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব তাঁর নিজের জীবনেও পড়েছে বলে দাবি আবু সাঈদ আকন্দের। তাঁর ভাষ্য, ২০১৪ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগদানের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় পরিবারের বিএনপি-সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ শাখা—এসবির যাচাই প্রক্রিয়ায় তাঁর ফাইল আটকে যাওয়ায় চাকরিতে যোগদান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তবে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি। এরপর কর্মজীবনে নেত্রকোনা, রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
আবু সাঈদ আকন্দের অভিযোগ, কর্মজীবনেও তাঁকে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি বহন করতে হয়েছে। তাঁর দাবি, কয়েকটি কর্মস্থলে তাঁকে এমন জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা কার্যত দূরবর্তী বা ‘ডাম্পিং পোস্টিং’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি করে।
পরবর্তীতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সংগঠনের সদস্যদের পেশাগত অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে সক্রিয় হওয়ার পর একটি মহলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।
সরকারি অনুষ্ঠানের ছবিই কি রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রমাণ?
সহকারী প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি সরকারি অনুষ্ঠানের ছবি সামনে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব ছবি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির নয়; বরং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় তোলা।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত থাকার সময় ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেখানে তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার উপস্থিত ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তিনি অতিথিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
লালমনিরহাট সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনের সময়ও দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেন আবু সাঈদ আকন্দ। ওই অনুষ্ঠানে তৎকালীন সংসদ সদস্য জি এম কাদেরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি।
তাঁর অভিযোগ, দায়িত্ব পালনের সময় তোলা এসব ছবিই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্য, সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত কোনো অতিথিকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শুভেচ্ছা জানানোকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বদলি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ
কর্মস্থল বদলের বিষয়েও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ করেছেন আবু সাঈদ আকন্দ। তাঁর দাবি, অপপ্রচার ও হয়রানির ধারাবাহিকতায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে তাঁকে রংপুরে বদলি করা হয়।
পরবর্তীতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রধান প্রকৌশলী তাঁকে ঢাকা জেলায় বদলি করেন বলে জানান তিনি। কিন্তু ঢাকা ফিরে আসার পরও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রচারণা বন্ধ হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
আবু সাঈদ আকন্দের মতে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে একজন নির্বাচিত পেশাজীবী প্রতিনিধিকে প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হেয় করা হলে তাঁর সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
আবু সাঈদ আকন্দের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে কথা বলেছেন চর আমখাওয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম মাস্টার। তাঁদের বক্তব্য, আবু সাঈদ আকন্দের বাবা ফজলুল হক আকন্দ দীর্ঘদিন স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ফজলুল হক আকন্দ ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি রোখসানা বেগমও পরিবারটির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ার আবু সাঈদ আকন্দের বাবা ফজলু চাচা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের বিএনপি নেতা ছিলেন। তাঁর বড় বোন হাসনা হেনা আমার সঙ্গে রাজনীতি করেন। আমি বেশ কয়েকবার তাঁদের বাড়িতে গিয়েছি। তাঁরা খুব ভালো মানুষ।’
প্রকৌশলী আবু সাঈদ আকন্দ যা বলছেন
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আবু সাঈদ আকন্দ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় এবং পরিচয় জাহির করাও উচিত নয়। চাকরির পাশাপাশি আমি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। সমিতির সদস্য প্রকৌশলীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করি। এতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা আছে। তারা তদন্ত করলেই আমার প্রকৃত পরিচয় বের হয়ে আসবে। আমার আর কিছু বলার নেই।’
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ওঠা অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেও আবু সাঈদ আকন্দের অবস্থান পরিষ্কার—তিনি চান, তাঁর পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হোক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের বিএনপি-সংশ্লিষ্টতার কথা স্থানীয় নেতারাও জানিয়েছেন। আবার সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের ঘটনাও রয়েছে। তবে এসব সরকারি দায়িত্ব পালনের ছবি বা ঘটনাকে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখানো কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আবু সাঈদ আকন্দের দাবি, পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে চাকরিতে প্রবেশ থেকে শুরু করে কর্মজীবনের বিভিন্ন সময় তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এখন সেই পরিচয়কে কেন্দ্র করে আবারও তাঁকে সামাজিক ও পেশাগতভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে। তাঁর প্রত্যাশা, অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক, সত্যতা যাচাই করা হোক। কারণ অপপ্রচার বা কোনো একটি ছবির ভিত্তিতে নয়, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে তাঁর কাজ ও দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত। শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রশ্নটিও সেখানেই—পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় আর কতদিন একজন মানুষকে নিজের কাঁধে বহন করতে হবে?