নূহ (আ.)-এর নৌকার সন্ধানে তুরস্কে নতুন অভিযান

✎ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে: ৬ অক্টোবর, ২০২৬

তুরস্কের ইরান সীমান্তবর্তী আগ্রি প্রদেশের দোগুবেয়াজিত জেলার একটি জাহাজের আকৃতির ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে গবেষণা। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ। তবে সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানেও সেই দাবি নিশ্চিত করার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত সর্বশেষ গবেষণার মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। গবেষকেরা কাঠামোটির ভূগর্ভস্থ অংশ পরীক্ষা করতে আধুনিক রাডার, ড্রোন, ত্রিমাত্রিক মানচিত্র, মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং কোর ড্রিলিংসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

মাটির নিচে মিলেছে অস্বাভাবিক গঠন

গবেষক দলের উপপ্রধান মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনস জানিয়েছেন, কোর ড্রিলিংয়ের সময় বিভিন্ন গভীরতা থেকে ধারাবাহিক মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি রাডার স্ক্যানে কাঠামোটির নিচে কয়েকটি অস্বাভাবিক গঠন শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, কাঠামোটি একটি একক কঠিন পাথরের খণ্ড হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। আগে ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ায় কোনো পাথর জাহাজের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। কিন্তু কোর ড্রিলিংয়ে বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিক মাটির নমুনা পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কাঠামোটি মানুষের তৈরি বা এটি নূহ (আ.)-এর নৌকার অবশেষ—এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছাননি গবেষকেরা।

রাডারে কী দেখা গেছে?

গবেষণায় ব্যবহৃত ভূগর্ভস্থ রাডার বা জিপিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির নিচের বিভিন্ন স্তর পরীক্ষা করা হয়েছে। সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাডার দিয়ে প্রায় ৭০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত ভূতাত্ত্বিক স্তর পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অস্বাভাবিকতা, ফাঁকা স্থান বা সম্ভাব্য কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য আছে কি না, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

গবেষণা-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কিছু স্থানে সমকোণ, স্তরবিন্যাস এবং সম্ভাব্য ফাঁকা অংশের মতো সংকেতও শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব বৈশিষ্ট্যের প্রকৃতি নিশ্চিত করতে আরও ভূতাত্ত্বিক ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সংগ্রহ করা হয়েছে শত শত নমুনা

সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে কাঠামোটির ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন স্তর থেকে কোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩৬৬টি মাটির নমুনা পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব নমুনায় জৈব পদার্থ এবং বয়স নির্ধারণের মতো পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে গবেষণা দলের সদস্যদের উদ্ধৃত করে কিছু প্রতিবেদনে প্রায় এক হাজার মাটির নমুনা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। নমুনার ধরন ও সংগ্রহের বিভিন্ন ধাপের কারণে সংখ্যার পার্থক্য থাকতে পারে।

গবেষকেরা বিশেষভাবে মাটিতে পাওয়া জৈব পদার্থের উৎস পরীক্ষা করছেন। এটি প্রাচীন কাঠ বা অন্য কোনো জৈব উপাদানের অবশেষ কি না, নাকি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল—পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া তা বলা সম্ভব নয়।

পাঁচ দেশের প্রায় ২০ বিজ্ঞানী

সর্বশেষ গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সেনকার আতিলা। প্রকল্পটিতে পাঁচ দেশের প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ অংশ নিয়েছেন।

২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। এ সময় ড্রোনের মাধ্যমে ভূখণ্ডের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি, জিপিএস পরিমাপ, ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি, ভূগর্ভস্থ রাডার পরীক্ষা এবং কোর ড্রিলিং করা হয়।

গবেষণার পরবর্তী ধাপে মাঠ থেকে পাওয়া তথ্য ও নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৫৯ সাল থেকেই রহস্য

জাহাজের মতো দেখতে এই কাঠামোটি ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামে পরিচিত। ১৯৫৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তুরস্কের ম্যাপিং প্রকৌশলী ইলহান দুরুপিনার বিমান থেকে পূর্ব আনাতোলিয়া অঞ্চলে জরিপ চালানোর সময় কাঠামোটির সন্ধান পান। এরপর থেকেই এটি নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে আগ্রহ তৈরি হয়।

তবে কয়েক দশক ধরে চলা আলোচনা ও বিভিন্ন অনুসন্ধান সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে এটিকে নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নূহ (আ.)-এর নৌকার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়লেও গবেষকেরা এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

গবেষণা দলের বক্তব্য অনুযায়ী, রাডার থেকে পাওয়া তথ্য, কোর নমুনা এবং মাটির রাসায়নিক ও বয়স নির্ধারণের ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার পরই কাঠামোটির প্রকৃতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০২৭ সালে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত গবেষণায় ভূগর্ভে কিছু অস্বাভাবিক গঠন ও বিভিন্ন ধরনের মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। কিন্তু এগুলো নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ—এমন বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সূত্র: সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়, ডেইলি সাবাহ

ই-প্রিন্ট