
ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ এর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ধরে দিল্লি-কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার বারবার তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানালেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় ছিল ককরোচ জনতা পার্টিসহ বিক্ষোভকারীরা।
এর আগে কংগ্রেসসহ সব বিরোধী দল তার পদত্যাগের দাবি তুলেছিল। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে অনশন শুরু করেছিলেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। ২৬ দিন পর গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি সেই অনশন ভাঙেন।
অবশেষে আজ শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা এলো। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধান তার পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন।
এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “যন্তর মন্তরসহ দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, দেশবিরোধী শক্তিগুলো যাতে এর সুযোগ নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন বজায় থাকে, ভারতের একটি ছাত্রের ভবিষ্যতও যেন আইনি জটিলতায় জড়িয়ে না পড়ে, এবং আমাদের সন্তানরা যেন পড়াশোনায় সময় দিয়ে ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দিতে পারে—এসব কথা মাথায় রেখে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি।”
ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন- এই খবর জানার পর সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, “আমরা সফল, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।”
“এটাই প্রমাণ যে, যদি ভয় না পান, যদি এই সরকারের সামনে মাথা নত না করেন, তাহলে যে কারও পদত্যাগপত্র নেওয়া যায়। গণতন্ত্রে ভয় পাবেন না,” বলেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের চিঠি
সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি চিঠি প্রকাশ করেছেন ধর্মেন্দ প্রধান। সেখানে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রথম দিন থেকেই আমি এ ঘটনার দায়িত্ব নিয়েছি এবং কখনও এই পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমার অঙ্গীকার ছিল, পরীক্ষা মাফিয়াদের কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে দেব না, কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি অন্যায় হতে দেব না।”
“কিন্তু এই সময়েও দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কিছু মানুষ বহু শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করার জন্য বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন, যা গভীর উদ্বেগ ও কষ্টের কারণ হয়েছে।”
তিনি লিখেছেন, “যন্তর-মন্তর এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে যাতে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি কাজে লাগাতে না পারে, দেশের ঐক্য যাতে অটুট থাকে, ভারতের একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যাতে আইনি জটিলতার মধ্যে না জড়িয়ে পড়ে, আমাদের সন্তানরা যাতে তাদের সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে পারে এবং নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনে মনোযোগ দিতে পারে, সেই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি।”
ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার যে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ভাবছে সেই ইঙ্গিত এসেছিল আজ সকালেই, যখন লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেন, সরকারে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী বলেন, “কিছু আলোচনা চলছে। এখন আমরা সরকারের ভেতর থেকেও বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যে, সমাধান হলো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু এটি ভারতের শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করতে হবে।”
রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীরাই ভারতের ভবিষ্যৎ, আর নরেন্দ্র মোদী ভারতের অতীত। অতীত কখনও ভবিষ্যতের সঙ্গে লড়াই করতে পারে না।
এর আগে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কটাক্ষ করে এক্সে লিখেছিলেন, তিনি মেট্রো, দোকানপাট, ইন্টারনেট, সড়ক এবং খাবার বন্ধ করতে পেরেছেন, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারেননি।
গত কয়েকদিন ধরেই যন্তর-মন্তরের কাছে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে দিল্লির কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ছিল। সবশেষ দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্থগিত করে। এক বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, ২৫শে জুলাই (শনিবার) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই ১৮টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকবে।
তবে রাজীব চক, মান্ডি হাউস এবং সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট স্টেশনগুলোতে আন্তঃলাইন পরিবর্তনের (ইন্টারচেঞ্জ) সুবিধা চালু থাকবে বলেও জানানো হয়।
নতুন আন্দোলনের হুমকিও ছিল
দিল্লির যন্তর-মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালনকারী ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সঙ্গে আজ সরকারের তৃতীয় দফা বৈঠকের কথা ছিল। তার আগেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে আলোচনার ‘অপরিবর্তনীয়’ দাবি হিসেবে উল্লেখ করেন বিক্ষোভকারীরা।
সিজেপির মুখপাত্র অশুতোষ রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে এক পোস্টে লিখেন, “যদি সরকারের পক্ষ থেকে ‘না’ আসে, তাহলে আর আলোচনার কোনো অর্থ থাকে না।”
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অশুতোষ রাঙ্কা বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনার ফলে ক্ষতিপূরণ এবং আইনি পদক্ষেপ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে একটি লিখিত সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের প্রধান দাবি, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে জবাব আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে এবং শিগগিরই দেশব্যাপী নতুন আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সিজেপি ও সরকারের মধ্যে এর আগে অনুষ্ঠিত দুই দফা আলোচনায় কয়েকটি দাবির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :