
সাইদুল ইসলাম (মাসুম), চট্টগ্রাম: দীর্ঘ অপেক্ষার পর সৌদি প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেটওয়ে’র সঙ্গে চুক্তি ছাড়াই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এ টার্মিনাল ১৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৪ নভেম্বর সৌদি প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেটওয়ে’র সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চুক্তি স্বাক্ষরের পর সুবিধাজনক সময়ে এটি উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে আনা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল উদ্বোধনের সব আনুষ্ঠানিকতা।
সে হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে (পিসিটি)-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। অবশ্য তার আগে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ-কে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দেড় বছর আগে গড়ে তোলা হয় টার্মিনালটি। কিন্তু দেশী নাকি বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে এ টার্মিনাল পরিচালনা করা হবে সেই জটিলতায় আটকে ছিলো এর অপারেশনাল কার্যক্রম।
এরই মধ্যে ‘রেড সি গেটওয়ে’ টার্মিনালকে রেসিডেন্স পারমিট (আরপি) ইস্যু করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথোরিটির পরিচালক (পিএমএফ) ও সরকারের উপ-সচিব মো. আলী আজম আল আজাদ।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপারেটর নিয়োগ চূড়ান্ত হলেও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করে টার্মিনালটি অপারেশনে যেতে আরও এক বছরের মতো সময় লাগতে পারে।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৩ জুন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। এক হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের শেষ সময় ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে ব্যয় আরও এক হাজার ৩৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আরডিপি বরাবরে আবেদন করে প্রকল্প সংস্থা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ লক্ষ্যে ২০২১ সালের মার্চ মাসে ‘ইক্যুইপ, অপারেট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’ প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথোরিটি (পিপিপি) টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে কাজ করছে। সৌদি আরব, দুবাই, ভারত ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পিসিটি পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রস্তাবনা দেয়। এর মধ্যে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল, দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড, ভারতের আদানি পোর্ট আ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড ও সিঙ্গাপুরের পিএস সিঙ্গাপুর প্রস্তাবনা জমা দেয়।
সর্বশেষে এসব প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই শেষে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে অপারেটর হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, আশা করছি এতে আমাদের বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্দরের মর্যাদাও আরও বাড়বে। আগামীকাল ১৪ নভেম্বর টার্মিনালটির উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। আর এর পরে সৌদি প্রতিষ্ঠান ‘রেড সি গেটওয়ে’র সঙ্গে আমাদের চুক্তি স্বাক্ষর হবে।
উল্লেখ্য, পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর ড্রাই ডক থেকে বোট ক্লাব পর্যন্ত নদীর পাড়ে ৩২ একর জায়গার ওপর নির্মিত টার্মিনালটি ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। যা চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। আর কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে ছয় মিটার দূরত্বে এ টার্মিনাল। এতে ১৬ একর ইয়ার্ড ও বিভিন্ন সুবিধাসহ ৬০০ মিটার জেটি রয়েছে।
এ টার্মিনালে একই সঙ্গে ১৯০ মিটার দীর্ঘ এবং সাড়ে ৯ মিটার গভীরতার তিনটি কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং ২২০ মিটার দীর্ঘ ডলফিন জেটিতে একটি তেলবাহী জাহাজ ভেড়ানো যাবে এবং বছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হবে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি। দেড় বছর আগে থেকেই টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
টার্মিনাল ছাড়াও পিসিটি প্রকল্পে এক লাখ ১২ হাজার বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড এবং রাস্তা রাখা হয়েছে। দুই হাজার ১২৮ বর্গমিটার কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন শেড (সিএফএস), ৬ মিটার উচ্চতার এক হাজার ৭৫০ মিটার কাস্টমস বন্ডেড ওয়াল, পাঁচ হাজার ৫৮০ বর্গমিটার পোর্ট অফিস ভবন, এক হাজার ২০০ বর্গমিটার যান্ত্রিক ও মেরামত কারখানা, ৪২০ মিটার ফ্লাইওভার, চার লেনের ১২শ মিটার সড়ক, সিকিউরিটি পোস্ট, গেস্টহাউজ, ফুয়েল স্টেশন এবং লেবার শেড তৈরি করা হয়েছে।
গত বছর ২১ জুলাই টার্মিনালটি উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়েও পিছিয়ে আসে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে গতি বাড়াতে এ পিসিটি টার্মিনাল তৈরি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।
আপনার মতামত লিখুন :