‘সংসদ হরিলুট’ কাণ্ডে গণপূর্তের উপ সহকারী প্রকৌশলী শামছুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ


এম এস শবনম শাহীন প্রকাশের সময় : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:২৫ অপরাহ্ণ
‘সংসদ হরিলুট’ কাণ্ডে গণপূর্তের উপ সহকারী প্রকৌশলী শামছুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটা ও সংস্কার কাজকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম ও ‘তার কেলেঙ্কারি’র কেন্দ্রে এবার উঠে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শামছুল আলমের নাম।

‎অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির বলয় তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে পুরো অনিয়মের চক্র, আর এই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে আড়ালে কাজ করেছে প্রভাবশালী কিছু নির্বাহী প্রকৌশলীর একটি সিন্ডিকেট।

‎দুদকে জমা পড়া অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় বৈদ্যুতিক কাজের নামে নিয়মিতভাবে নিম্নমানের তার, ক্যাবল, সাউন্ড সিস্টেম এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপন করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য শামছুল আলম পরিকল্পিতভাবে অতিমূল্যায়িত প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরি করতেন, যা প্রকৃত বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। অভিযোগ রয়েছে, এই ভুয়া প্রাক্কলনের মাধ্যমেই বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল।

‎সূত্র বলছে, শুধু প্রাক্কলন তৈরিই নয়—পুরো ক্রয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে শামছুল আলম ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থায়ও কারসাজি করতেন। নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার শর্ত এমনভাবে সাজানো হতো, যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকে। বিনিময়ে এসব ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। ফলে সরকারি প্রকল্পগুলো কার্যত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে।

‎তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শামছুল আলমের এই অনিয়মগুলো এককভাবে পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। তার তৈরি করা অতিমূল্যায়িত ও ভুয়া প্রাক্কলনগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কিছু নির্বাহী প্রকৌশলী। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল উত্তোলনের নজির পাওয়া গেছে।

‎অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এই প্রকৌশলীর নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ায় অঢেল সম্পদের তথ্য। যার একাধিক রেকর্ডের নথিপত্র, তথ্যচিত্র লাখোকণ্ঠ’র প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরের ব্যবধানে তার এই সম্পদ বৃদ্ধি অস্বাভাবিক এবং তা স্বাভাবিক আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‎অভিযোগের প্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয় নিয়ে উপ সহকারী প্রকৌশলী শামছুল আলমের সঙ্গে  মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনপ্রকার সাড়া দেননি।

‎এদিকে, সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়টি এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কারিগরি মান যাচাই ছাড়াই স্থাপন করা ক্যাবল, সাউন্ড সিস্টেম ও অন্যান্য সরঞ্জামের কারণে অগ্নিকাণ্ডসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়, বরং সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর অবহেলা।

‎দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “শামছুল আলমের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং পরিকল্পিত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়। তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কসহ সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা তাকে সহায়তা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

‎তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগিরই শামছুল আলম ও তার ঘনিষ্ঠদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং এতে জড়িয়ে পড়তে পারেন আরও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

‎জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি সংবেদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ‘তার কেলেঙ্কারি’র অভিযুক্ত শামছুল আলম শেষ পর্যন্ত আইনের মুখোমুখি হন কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। তদন্তের গতি ও কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, দুর্নীতির এই জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০