মোঃ আব্দুল কালাম :জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও চা মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও চায়ের রাজধানীখ্যাত এই অঞ্চলে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি কর্মকর্তা, চা বাগানের মালিক পক্ষ এবং প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থল মুখরিত ছিল। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে চা বাগানের আসল প্রাণ—সাধারণ চা শ্রমিকদের নির্মম বাস্তবতা। কোটি টাকার বাজেট ও প্রচারণার এই উৎসবে শ্রমিকের প্রাপ্তি শূন্যের কোঠায়।
বাজেটের জাঁকজমক ও শ্রমিকের রেশনের চাল চা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতি বছর এই দিবসের পেছনে বিপুল অংকের বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়। সাজসজ্জা, অতিথিদের আপ্যায়ন, যাতায়াত এবং প্রচারণায় লাখ লাখ টাকা উড়ানো হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, দিবসটি উদযাপনে যে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাজেট ব্যয় হয়, তার ক্ষুদ্র একটি অংশও সাধারণ শ্রমিকের ভাগ্যোন্নয়নে সরাসরি খাটানো হয় না। যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্তুতি গাওয়া হয়, তখন প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা চা শ্রমিক তার পরিবারের রাতের খাবারের দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকেন।
দৈনিক ১৭০ টাকার খাঁচায় বন্দি জীবন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের চা বাগানগুলোতে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালালে দেখা যায়, তীব্র মূল্যস্ফীতির এই বাজারে এখনও একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মূল মজুরি মাত্র ১৭০ টাকা। এই সামান্য টাকা দিয়ে চাল, ডাল, তেল কেনা তো দূরের কথা, এক কেজি ভালো মানের চাল কিনতেই দৈনিক উপার্জনের অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। অথচ চা দিবস উপলক্ষে যে ব্যানার-ফেস্টুন তৈরি হয়, তার একেকটির খরচ একজন শ্রমিকের কয়েক দিনের মজুরির সমান। উৎসবের বাজেট যখন কোটি টাকার ঘর ছোঁয়, তখন শ্রমিকের ঘরে তিন বেলা ঠিকমতো অন্ন জোটে না।
অধরাই রয়ে গেল মৌলিক অধিকার চা দিবসের সেমিনারে টেকসই উন্নয়নের বুলি আওড়ানো হলেও শ্রীমঙ্গলের অলসপুর, ভাড়াউড়া বা জেরিন চা বাগানের কুঁড়েঘরগুলোর দিকে তাকালে উন্নয়নের আসল কঙ্কাল চোখে পড়ে। শ্রমিকদের বাসস্থানগুলো এখনও জরাজীর্ণ। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট এখানকার নিত্যসঙ্গী। বাগানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা নাজুক, যার ফলে শ্রমিক সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন শুরুতেই ভেস্তে যায়। অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই বাগানের হাসপাতালগুলোতে; সেখানে মেলে শুধু প্যারাসিটামল। চা দিবসের বিশাল বাজেটে কি এই মৌলিক সংকটগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান খোঁজা হয়েছে? উত্তরটি নেতিবাচক।
শ্রমিকের ক্ষোভ: “আমাদের রক্তে উৎসব, আমাদের পেটে ক্ষুধা” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীমঙ্গলের কয়েকজন প্রবীণ চা শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিবস দিয়ে আমাদের কী হবে? সাহেবরা এসে এয়ারকন্ডিশন গাড়িতে ঘুরে যায়, মেডেল নিয়ে যায়। আর আমরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে চা পাতা তুলি। আমাদের মজুরি বাড়ে না, বোনাস ঠিকমতো পাই না। এই উৎসব তো আমাদের উপহাস করার জন্য।”
জাতীয় চা দিবস তখনই সার্থক হবে, যখন চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া ভিআইপিদের পাশাপাশি সেই চা পাতা চয়নকারী শ্রমিকের মুখেও হাসি ফুটবে। উৎসবের নামে রাষ্ট্রের ও চা বোর্ডের কোটি টাকার বাজেট অপচয় বন্ধ করে তা সরাসরি শ্রমিকদের আবাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। শ্রীমঙ্গলে চা দিবস পালিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চা শ্রমিকের লাভ বলতে কেবলই বেড়েছে দীর্ঘশ্বাস। এই শোচনীয় বৈষম্য দূর না হলে চা দিবস কেবলই একটি কর্পোরেট প্রহসন হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :