
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার নাজমুল ইসলামকে ঘিরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সিলেট অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বণ্টন এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিলেট জেলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা খন্দকার নাজমুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাঠপর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ কার্যত বাধাগ্রস্ত হতো।
অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে, সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে একপর্যায়ে স্থানীয় ঠিকাদাররা সম্মিলিতভাবে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন বলে জানা গেছে। ওই কর্মসূচিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ এবং তার কর্মকাণ্ডের তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। বিষয়টি সে সময় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি, কাজের নিম্নমান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ বেশি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তব কাজের মধ্যে বিস্তর অসঙ্গতি ছিল, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তীব্র অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন ও বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার অভিযোগও রয়েছে প্রভাবশালী এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ।
এছাড়াও ঠিকাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায়ের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা চালু ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আকার ও অর্থমূল্যের ভিত্তিতে কমিশনের হার নির্ধারণ করে অর্থ আদায় করা হতো বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
অনুসন্ধানে তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের প্রাথমিক তথ্যও সামনে এসেছে। বৈধ আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজ জেলা কুমিল্লাতেও খন্দকার নাজমুল ইসলামের বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ-সংক্রান্ত একাধিক তথ্য ও নথিপত্র এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
দপ্তরের অভ্যন্তরেও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। বদলি, পদোন্নতি এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, বিগত দিনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তিনি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে এই প্রকৌশলী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত থাকলেও তার পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড, টেন্ডার অনিয়ম, কমিশন বানিজ্য, এবং দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয় নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার নাজমুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি।
টেন্ডার অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অপব্যবহারের অভিযোগে ঘিরে থাকা খন্দকার নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :