বর্ষা এলেই পানির নিচে রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু


প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৯ অপরাহ্ণ ১০৪
বর্ষা এলেই পানির নিচে রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু

রাঙামাটি প্রতিনিধি

রাঙামাটির পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু বছরের পর বছর ধরে জেলার পর্যটনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে বর্ষা এলেই কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে সেতুটির পাটাতন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে পর্যটন কার্যক্রম।

এতে একদিকে কাঙ্ক্ষিত আকর্ষণটি দেখতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরছেন পর্যটকরা, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে বোট চালকসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার। এবারও গত ২৯ আগস্ট থেকে পানিতে তলিয়ে যায় রাঙামাটির এই পর্যটন আইকন। পরে হ্রদের পানি কিছুটা কমে ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে সেতুটির অধিকাংশ অংশ ভেসে উঠলে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যটকদের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পানিতে হ্রদের পানি আবারও বেড়ে যাওয়ায় গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে সেতুর পাটাতন পুনরায় পানিতে তলিয়ে যায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঝুঁকি এড়াতে সেতুতে পর্যটকদের প্রবেশ ও চলাচলে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে কর্তৃপক্ষ।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত বেড়ে গেলে সেতুটি পানিতে তলিয়ে যায়। ওই দিন দুপুর থেকেই পর্যটকদের প্রবেশ ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরে পানি কমে গেলে সেতুটির অধিকাংশ অংশ ভেসে ওঠে এবং ৫ সেপ্টেম্বর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে পর্যটকদের জন্য তা খুলে দেওয়া হয়।
আশির দশকে রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে শহরের শেষ প্রান্তে দুটি দ্বীপকে সংযুক্ত করতে নির্মাণ করা হয় ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ এই ঝুলন্ত সেতু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে রাঙামাটির পর্যটনের প্রতীক, পরিচিতি পায় ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ হিসেবে।
তবে সেতুটি নির্মাণের সময় কাপ্তাই হ্রদের পানির সর্বোচ্চ স্তর ও রুলকার্ভের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের মত। ফলে বর্ষা মৌসুমে হ্রদের পানি বাড়লেই প্রতিবছর একই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর কেন একইভাবে পানিতে তলিয়ে যাবে রাঙামাটির এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থাপনা? এর স্থায়ী সমাধানই বা কী?
শুধু পর্যটকদের হতাশাই নয়, ঝুলন্ত সেতু পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটননির্ভর মানুষের আয়-রোজগারেও। সেতুকে ঘিরে প্রতিদিন বোট নিয়ে পর্যটকদের আনা-নেওয়া করেন বহু চালক। সেতু বন্ধ থাকায় পর্যটকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে, কমছে বোটের ট্রিপও। একইভাবে পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কক্সবাজার থেকে রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটক মো. জামিল বলেন, “ঝুলন্ত সেতু দেখতে এসে দেখলাম সেতুর ওপর পানি উঠে গেছে। তবে সেতুর ওপর পানি উঠে যাওয়ার পরও এর ওপর দিয়ে হাঁটার মধ্যে অন্যরকম একটি অনুভূতি আছে।”

ঢাকা থেকে রাঙামাটি ভ্রমণে আসা পর্যটক শুভ্র নীল বলেন, “সত্যিকার অর্থে আমরা জানতাম না যে ঝুলন্ত সেতু পানিতে তলিয়ে গেছে। তারপরও অনেকে পানির ওপর দিয়ে হাঁটছেন। যেহেতু সেতুটি প্রতিবছর পানির নিচে তলিয়ে যায়, তাই এটি সংস্কার করা খুবই জরুরি।”
রাঙামাটি পর্যটন নৌ-যান ঘাটের টোল আদায়কারী মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছর বর্ষাকালে উজানের পানি নেমে সেতুর পাটাতন ডুবে যায়। এতে সেতু দেখতে পর্যটক কম আসে রাঙামাটিতে। ঝুলন্ত সেতুটিকে আধুনিকায়ন করা গেলে রাঙামাটিতে পর্যটক আরও বাড়বে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সেতুটিকে বর্তমান অবস্থান থেকে অন্তত পাঁচ ফুট উঁচু করা গেলে প্রতিবছর পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বর্তমানে সেতুটি প্রায় ১০৫ ফুট লেভেল বিবেচনায় নির্মিত। এটিকে পাঁচ ফুট উঁচু করা হলে উচ্চতা দাঁড়াবে প্রায় ১১০ ফুটে। অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদের সর্বোচ্চ পানির স্তর ধরা হয়েছে ১০৯ ফুট। ফলে সামান্য উচ্চতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

এদিকে রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশন জানিয়েছে, তাদের আবেদনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড নতুন একটি আধুনিক ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করে পাঠিয়েছে। প্রস্তাবিত আধুনিক ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণে প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা।

রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, “প্রতি বছর ঝুলন্ত সেতু ডুবে যাওয়ার কারণে আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটকদের একটি আধুনিক ঝুলন্ত সেতু উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
আলোক বিকাশ চাকমা আরও জানান, উজানের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় সেতুটি পানিতে ডুবে যায়। বর্তমানে সেতুটির পাটাতন প্রায় ৮-১০ ইঞ্চি পানির নিচে রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তুষিত চাকমা বলেন, প্রকল্পটির যাচাই কমিটির সভা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ডিপিপি পুনর্গঠন করে মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি প্রেরণ করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শুধু বর্ষা এলেই সেতু বন্ধ রাখা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। কাপ্তাই হ্রদের পানির ওঠানামার সঙ্গে যাতে রাঙামাটির পর্যটনের এই আইকনকে বারবার হারিয়ে যেতে না হয়, সে জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাদের।
কারণ, একটি সেতু শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করে না। রাঙামাটির ক্ষেত্রে এই ঝুলন্ত সেতুটি যুক্ত করেছে পর্যটন, বোট ব্যবসা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং জেলার অর্থনীতির একটি বড় অংশকে। তাই প্রতিবছর বর্ষায় সেতুটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০