অপ্রতিমের নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিবেকও


সাইফুল ইসলাম তালুকদার প্রকাশের সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:০৩ অপরাহ্ণ ৬০
অপ্রতিমের নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিবেকও

অপ্রতিমের বয়স মাত্র তেরো বছর। যে বয়স থাকার কথা শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, বন্ধুত্ব, হাসি আর স্বপ্নে। যে বয়সে একটি শিশুর ভাবার কথা পরীক্ষা, ফুটবল, প্রিয় খেলা আর বড় হয়ে কী হবে-এসব নিয়ে।

কিন্তু অপ্রতিম আর নেই। তার নিথর শরীর আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে-আমরা কি এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছি, যেখানে একটি মোবাইল ফোনও একটি শিশুর জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে?

এটি শুধু একটি শিশু বা একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর প্রশ্ন-অভিভাবক হিসেবে, সমাজ হিসেবে এবং মানুষ হিসেবে। একটি শিশুর কষ্ট একজন বাবা-মায়ের কষ্ট আমিও একজন বাবা। আমার মেয়ের বয়স বারো বছর। কিছুদিন আগে দুবাইয়ের একটি পার্কে খেলতে গিয়ে সে পড়ে কপালে আঘাত পেয়েছিল। আমি তখন কাছেই ছিলাম। আঘাত গুরুতর ছিল না। কিন্তু তাকে পড়ে যেতে দেখে এবং তার কান্না শুনে মুহূর্তেই আমার ভেতরটা হিম হয়ে গিয়েছিল।

একটি শিশু কষ্ট পেলে একজন বাবা-মায়ের ভেতরে কী ঘটে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই কারণেই অপ্রতিমের বাবা-মায়ের কথা ভাবলে বুক ভার হয়ে আসে।
একজন বাবা যখন তার সন্তানকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তিনি কী অনুভব করেন? একজন মা যখন বুঝতে পারেন, যে কণ্ঠস্বর, পায়ের শব্দ ও প্রিয় মুখটি প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিল, সেটি আর কখনো ফিরে আসবে না-সেই শূন্যতার কোনো ভাষা কি আছে?

আমরা কি সন্তান মানুষ করছি, নাকি শুধু তাদের চাহিদা পূরণ করছি?

আজকের ভোগবাদী সমাজে আমরা অনেক সময় সন্তানের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করাকেই ভালোবাসা মনে করি-নতুন মোবাইল, দামি ডিভাইস, ব্র্যান্ডের জুতা, নতুন গেম কিংবা আরও আরামদায়ক জীবন।

সন্তানের জন্য ভালো কিছু চাওয়ার মধ্যে কোনো ভুল নেই। কিন্তু তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি যেন আমরা ভুলে না যাই-কোনো বস্তুই মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।

ফোন বদলে নেওয়া যায়। অর্থ আবার উপার্জন করা যায়। সম্পদ আবার কেনা যায়। প্রযুক্তি পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু একটি জীবন কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না।
আমরা খুব দ্রুত ভুলে যাই

একটি ট্র্যাজেডি আজ আমাদের নাড়া দেয়, আগামীকাল আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি, ন্যায়বিচারের দাবি জানাই। এরপর আরেকটি ঘটনা আসে, আরেকটি নাম আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে আগের ঘটনাটি হারিয়ে যায়।

সমস্যা শুধু কাউকে ভুলে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় পরবর্তী প্রতিরোধের দায়িত্বও।

ন্যায়বিচার মানেই শুধু শাস্তি নয়

অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, কোনো অবহেলা বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জল্পনা দিয়ে নয়, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে।

ন্যায়বিচার মানে দ্রুত কাউকে দায়ী করা নয়; ন্যায়বিচার মানে সত্য উদঘাটন করা। কেউ দায়ী হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তার দায় নির্ধারণ করতে হবে। আর ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিশুর জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে, সেই শিক্ষাও নিতে হবে।

অপ্রতিম যেন শুধু আরেকটি নাম হয়ে না থাকে

একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। অভিভাবক, বিদ্যালয়, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও রাষ্ট্র-সবার দায়িত্ব রয়েছে।

শিশুদের শুধু দামি ফোন বা আরামদায়ক জীবন নয়; প্রয়োজন ভালোবাসা, মনোযোগ, দিকনির্দেশনা, সীমারেখা এবং এমন একজন মানুষ, যিনি তাদের কষ্টের কথা শুনবেন।

অপ্রতিমের মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিক-প্রতিটি শিশুর মুখের আড়ালে একটি স্বপ্নের পৃথিবী আছে এবং তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিবার।

তেরো বছরের একটি শিশু যেন আমাদের ব্যর্থতার প্রতীক না হয়; বরং তার স্মৃতি আমাদের পরিবর্তনের কারণ হয়ে উঠুক।

অপ্রতিমের স্মৃতির পাশে একটি পরিবার দাঁড়িয়ে আছে। তার ট্র্যাজেডির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি সমাজ। দায়িত্বের প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। আর

সর্বোপরি, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিবেকও।

অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি শুধু তার পরিবারের দাবি নয়-এটি আমাদের মানবিকতারও পরীক্ষা।

লেখক: সভাপতি, প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি- ইউএই। ই-মেইল: saifdbc1974@gmail.com

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০