ইনানীতে ক্যামেরায় মিলল মেঘলা চিতা, শনাক্ত ২৩ প্রজাতির প্রাণী


বিবিসি বাংলা প্রকাশের সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ণ ৩৮
ইনানীতে ক্যামেরায় মিলল মেঘলা চিতা, শনাক্ত ২৩ প্রজাতির প্রাণী

কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির মেঘলা চিতা, উল্লুক ও এশীয় হাতি। গবেষণায় প্রথমবারের মতো ইনানী এলাকায় মেঘলা চিতার উপস্থিতির প্রমাণও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাসের পরিচালিত গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট, সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং প্রাণীর বিষ্ঠা, পায়ের ছাপ ও গাছের আঁচড়ের মতো পরোক্ষ চিহ্ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার জন্য পুরো উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করা হয়। বনের ৩২টি স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করে প্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রায় ৩০০ মানুষের সঙ্গে কথা বলে বনাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাসের ভাষ্য, গবেষণাটির দুটি প্রধান দিক ছিল—ইনানীর স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৈচিত্র্য এবং এসব প্রাণীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ। কোন এলাকায় কোন প্রাণীর উপস্থিতি বেশি, সেখানে কী ধরনের গাছ রয়েছে এবং পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীগুলোর সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ও গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণায় শনাক্ত হওয়া ২৩ প্রজাতির মধ্যে এশীয় হাতি, মায়া হরিণ, বনশূকর, পশ্চিমের উল্লুক, লাল বানর, মুখপোড়া হনুমান, মেছোবিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, সোনালি শিয়াল, মালয় শজারু, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি ও গেছো ছুঁচোসহ বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে।

ক্যামেরায় মেঘলা চিতা

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মেঘলা চিতার উপস্থিতি। বাংলাদেশে অত্যন্ত বিপন্ন এই বন্যপ্রাণীর ইনানী জাতীয় উদ্যানে উপস্থিতির প্রমাণ এর আগে গবেষণায় পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষক।

গবেষণায় ক্যামেরা ট্র্যাপে মেঘলা চিতার পাঁচটি উপস্থিতির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও বিষ্ঠাসহ বিভিন্ন পরোক্ষ চিহ্ন বিশ্লেষণ করেও আরও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মেঘলা চিতা বিড়াল গোত্রের অত্যন্ত বিরল একটি প্রাণী। গাছে চলাচলে এরা বিশেষভাবে দক্ষ এবং দিনের বড় একটি সময় গাছেই কাটায়। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রাণীটি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং বাংলাদেশে এর সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু প্রাণী নয়, গবেষণায় বনও

ইনানী জাতীয় উদ্যানে ৬৬ প্রজাতির গাছও শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে, সেখানে প্রাণীর বৈচিত্র্যও বেশি। অন্যদিকে বাগান, বন ধ্বংস বা পরিবর্তিত এলাকায় প্রাণীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস মনে করেন, প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় উপযোগী দেশীয় গাছ লাগানো এবং প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করা জরুরি। নির্দিষ্ট প্রাণী কোন ধরনের গাছ ও পরিবেশ পছন্দ করে, তা বিবেচনায় নিয়ে আবাসস্থল উন্নয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে এসব প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

প্রায় ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর আয়তনের ইনানী জাতীয় উদ্যান উপকূলীয় ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। গবেষকদের মতে, এই বনাঞ্চল ভারতের ও মিয়ানমারের বনভূমির সঙ্গে বন্যপ্রাণীর চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবেও ভূমিকা রাখে।

বাড়ছে নানা ধরনের চাপ

গবেষকরা বলছেন, ইনানীর জীববৈচিত্র্য নানা ধরনের মানবসৃষ্ট চাপের মুখে রয়েছে। স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির পাশাপাশি বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ, পাহাড় কাটা, গাছ কেটে কৃষিকাজ, অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার—এসব কারণে প্রাণীদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষ করে সড়ক নির্মাণের কারণে এশীয় হাতিসহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচলের প্রাকৃতিক করিডোর বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জনবল ও অর্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সংরক্ষিত এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনাও করা সম্ভব হচ্ছে না।

তার মতে, দেশের সব সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন। বিপন্ন প্রাণীগুলোর আবাসস্থল সুরক্ষিত করা গেলে অনেক প্রজাতিকে আরও নিরাপদ অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

গবেষকদের মতে, একটি বনাঞ্চলের প্রতিটি প্রাণীই বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই।

ইনানী জাতীয় উদ্যানে বিপন্ন প্রাণীদের উপস্থিতি একদিকে যেমন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধির প্রমাণ দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের আবাসস্থল রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

 

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০