উত্তেজনার মাঝেও যে কারণে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু কেন্দ্রে হামলা করে না


লাখোকণ্ঠ অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০২৬, ৫:৪২ অপরাহ্ণ
উত্তেজনার মাঝেও যে কারণে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু কেন্দ্রে হামলা করে না

 উত্তেজনার মাঝেও যে কারণে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু কেন্দ্রে হামলা করে না। ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে ইরানের নাতানজ, ফোরদো ও ইসফাহানের পরমাণু স্থাপনা- বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাতে বেসামরিক পরমাণু অবকাঠামোগুলো ক্রমাগত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো সামাজিক বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (ট্যাবু) হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এই নিষেধাজ্ঞা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। খবর এনডিটিভির।

অতীতে ইরাক ও সিরিয়ার পরমাণু কেন্দ্রে ইসরায়েলের হামলা, কিংবা সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এবং বাঙ্কার বাস্টার বোমার ব্যবহার বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। বেসামরিক পরমাণু কেন্দ্রে যেকোনো হামলা মানেই সীমান্তহীন তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহ ঝুঁকি।

ঠিক এই অস্থিতিশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিরশত্রু দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক সংযম বিশ্বকে অনুকরণীয় শিক্ষা দিচ্ছে।

ভারত ও পাকিস্তান- উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাস সবার জানা। এমনকি গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে চার দিনের তীব্র সামরিক সংঘাতে লড়তে হয়েছিল দেশ দুটিকে। দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনাও নেই। তবুও, চরম উত্তেজনা ও সক্রিয় যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও একটি জায়গায় দুই দেশই কঠোর সংযম দেখিয়েছে- কেউ কারও পরমাণু স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেনি।

এই সংযম কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি তিন দশকেরও বেশি পুরোনো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সুদৃঢ় ফসল। ১৯৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নেতৃত্বে ‘পরমাণু স্থাপনা ও কেন্দ্রে হামলা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়, যা ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হয়।

এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রতি বছর ১ জানুয়ারি দুই দেশ একযোগে নিজেদের পরমাণু স্থাপনার তালিকা একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করে। ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া এই চর্চা আজ পর্যন্ত এক বছরের জন্যও বন্ধ হয়নি। চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দেশ দুটি টানা ৩৫ বারের মতো সফলভাবে এই তালিকা বিনিময় সম্পন্ন করেছে। নিউ দিল্লি ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র ও জ্বালানি ইউনিটের সুনির্দিষ্ট তালিকা শেয়ার করা হয়, যাতে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই স্থানগুলোকে এড়িয়ে চলা যায়।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের (এনএসএবি) সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ডি বি ভেঙ্কটেশ বর্মা এই চুক্তিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, পরমাণু কেন্দ্রে হামলা না করার ক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তানের এই চুক্তিটি সমগ্র বিশ্বে অনন্য।

জাতিসংঘ ও আইএইএতে ভারতের সাবেক প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আকবরউদ্দিন ১৯৯০-এর দশকে ইসলামাবাদে কর্মরত থাকাকালীন নিজে এই তালিকা বিনিময়ে অংশ নেওয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, দ্বিপাক্ষিক স্তরে এটি অত্যন্ত বিরল ও অনন্য নজির। আজ যখন বিশ্বজুড়ে পরমাণু কেন্দ্রগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ঝুঁকিতে পড়ছে, তখন ভারত-পাকিস্তানের এই ব্যবস্থাটি দশকের পর দশক ধরে সফলভাবে কাজ করছে।

সৈয়দ আকবরউদ্দিনের মতে, তেজস্ক্রিয়তা যেহেতু কোনো সীমান্ত চেনে না, তাই ভারত-পাকিস্তানের এই দ্বিপাক্ষিক মডেলটিকে আরও বড় আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক কাঠামোতে রূপান্তর করা সম্ভব কি না, তা বিশ্বের ভেবে দেখা উচিত।

তবে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন, এই ধরণের সফল মডেল অন্য অঞ্চলে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন হতে পারে, কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রযুক্তিগত পরিবেশ ভিন্ন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরমাণু কেন্দ্রে হামলা না করার আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিকে অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। বর্তমানে ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পরমাণু কেন্দ্রে আইএইএর বিশেষজ্ঞরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, যা বিশ্বের পরমাণু নিরাপত্তার ভঙ্গুর চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।

ভারত আগামী বছরগুলোতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে (১ লাখ মেগাওয়াট) উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে বড় ধরনের সম্প্রসারণের দিকে এগোচ্ছে। এই বিশাল বিনিয়োগের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে পরমাণু আগ্রাসন বিরোধী এই চুক্তিটির কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বীমা সংস্থাগুলোর ঝুঁকি হ্রাস করে ও যেকোনো যুদ্ধের সময়েও এই ক্রিটিক্যাল অবকাঠামোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

ভারত-পাকিস্তান চুক্তি হয়তো দুই দেশের সব দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, কিংবা সীমান্ত উত্তেজনাও পুরোপুরি মেটাতে পারেনি। তবে এটি প্রমাণ করেছে, চরম শত্রুতামূলক সম্পর্কের মধ্যেও সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০