
তিনি বলেন, সব শ্রেণির মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে এটি একটি ক্রিয়েটিভ বাজেট। বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ ভবনের নিজের চেম্বারে বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, এ বাজেট মূলত উৎপাদনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং ব্যবসাবান্ধব। এ বাজেটে যে ছাড়গুলো দেওয়া হয়েছে, যে রেয়াত দেওয়া হয়েছে, আমরা এর আগে এত বড় ছাড় দেখতে পাইনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের দিক তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এর ফলে অর্থনীতি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সচল হবে এবং আমরা আশা করি যে, খুব দ্রুত বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তার চিন্তা-ভাবনাগুলোকে নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ মন্ত্রণালয়ের সকলের সহযোগিতা নিয়ে এই বাজেট প্রণয়ন করেছেন।স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন বসে বিকেল ৩টায়। অর্থমন্ত্রী এই অধিবেশনে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। স্পিকার রবিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনে দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পরে মাঝখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারা ঠিক সেভাবে দেশকে একটা ট্র্যাকের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি, একটা অগোছালো প্রশাসন এবং অর্থনীতির চরম দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং দায়িত্ব এসে পড়েছে বিএনপি সরকারের উপরে।
তিনি বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় গঠনে সরকার কতটা আন্তরিক। একই সঙ্গে সরকার অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে চায়।
এর সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে, সম্পূর্ণ একটা ক্রিয়েটিভ বাজেট বলব আমি এটাকে। এর মধ্যে কতগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যে পদক্ষেপগুলো আমরা কেউ চিন্তাও করতে পারি না।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এখানে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে, এটা একটা বিশাল ব্যাপার এবং এতে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবার প্রধান মহিলাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হবে। সেখানে ফ্যামিলি কার্ডে খরচ হবে ১ লাখ তিনশ’ ৩৮ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ এই অর্থবছরে। পরে সেটা বাড়তে থাকবে।’
‘একই ভাবে কৃষক কার্ড করা হয়েছে, প্রতি কৃষক পাবেন আড়াই হাজার টাকা করে। মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রতিমাসে সম্মানী প্রদান করা হবে, খাল খননের মধ্য দিয়ে কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, মৎস্য চাষ এই ধরনের উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় আমার কাছে যে জিনিসটা সেটা হলো, দেশীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে যারা বিভিন্ন খাতে উৎপাদন করতে যাবেন, বিনিয়োগ করতে যাবেন তাদেরকে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে এটা আগে কখনো দেওয়া হয়নি এবং সমস্ত কর রেয়াত দেওয়া হয়েছে এবং অন্য সব রকমের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে এবং যেখানে যেগুলো আমাদের দেশীয় উৎপাদন হয়, সেগুলোকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করার ব্যাপারে কর আরোপ করা হয়েছে অর্থাৎ প্রটেকশন পুরোপুরিভাবে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, কৃষির ক্ষেত্রেও সেটা করা হয়েছে এবং আমাদের ক্রিয়েটিভ ইকোনমি যেটাকে বলছে এটা অত্যন্ত নতুন ধরনের একটা চিন্তাভাবনা। স্পোর্টস ইকোনমিতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানী প্রদান করা হচ্ছে, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস আয়োজন করা হবে এবং ইন্টার স্কুল খেলা আবার চালু করা হচ্ছে।
‘একই সঙ্গে ১২ থেকে ১৪ বছরের ক্রীড়া শিক্ষার্থীদেরকে বৃত্তি প্রদান করা হবে এবং ৬৪ জেলায় ৬৪ ভিলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এগুলো সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা এবং একই সঙ্গে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সংস্কৃতিকে পুরোপুরিভাবে একটা ইকোনমির মধ্যে নিয়ে আসার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। একটি গ্রাম একটি পণ্য উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, বুননশিল্প শীতল পাটি শতরঞ্চি সব ধরনের ক্রিয়েটিভ পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোকে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘লোকসংস্কৃতি, হস্তশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার প্রসারের চেষ্টা করা হবে। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে ১৬০ একর জায়গার উপর বিশ্বমানের ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করা হবে। এই জিনিসগুলো হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের চিন্তাভাবনা। এগুলো আমাদের অর্থনীতিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
এসএসই খাতের বিকাশে শর্তে ঋণ বিতরণ, প্রবাসী কার্ড প্রদান, হাইটেক পার্ক প্রভৃতি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, গ্রামীণ সড়ক সংরক্ষণে নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখবেন যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আপনার বিনিয়োগ বৃদ্ধির ব্যাপারটা এখানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে আইনের সংস্কার ও সহজীকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে যারা বিদেশ থেকে বিনিয়োগ করতে আসবেন তারাও উপকৃত হবেন, যারা দেশে বিনিয়োগ করবেন তারা উপকৃত হবেন।
শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ দশমিক ১ এ উন্নীত করার এই দুই খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন মির্জা ফখরুল।
রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য কর প্রদানে হয়রানি রোধের কথা উল্লেখ করে অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক মির্জা ফখরুল বলেন, আইনের নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত না, সেগুলোকে তুলে দেয়া হয়েছে। এখন ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারবেন। তারা নিজেরা কর দিতে পারবেন, রিটার্ন দিতে পারবেন সহজভাবে। আমার কাছে মনে হয়েছে এগুলোকে বেশি বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনাকে পৃথকীকরণ করা হয়েছে। করদাতাদের পরিধিটাকে অনেক বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন হবে, স্বয়ংক্রিয় করের মাধ্যমে উৎেসে কর যাচাইয়ের সময় কমিয়ে আনা হবে, জনবান্ধব কর প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি করা হবে, রপ্তানি সম্ভাবনাময় সকল খাতকে কাস্টমস বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত ভাবে কাঁচামাল উপকরণ আমদানি সুবিধা প্রদান করা হবে। এই উদ্যোগগুলো এই বাজেটের সবচেয়ে মূল বিষয়। আমি মনে করি যে এই বাজেট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটা যুগান্তকারী বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।’
বাজেটে মূল্যস্ফীতি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি এমনিতেই কমে আসবে।’
আপনার মতামত লিখুন :