
বাহ্যিকভাবে ধর্মপরায়ণতার ছাপ—মুখে লম্বা দাড়ি, নিজেকে হাজী পরিচয়ে পরিচিত—দেখলে সহজেই তাকে একজন সাদাসিধে ধর্মভীরু মানুষ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ বলছে ভিন্ন গল্প! রাজধানীর বাড্ডা সাব রেজিস্ট্রার অফিস-এ নথি সংক্রান্ত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এখন আলোচনায় নকলনবীশ হাজ্বী আলাউদ্দিন টুটুল। যার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের রয়েছে গুরুতর অভিযোগের পাহাড়।
বাড্ডা সাব রেজিস্ট্রার অফিস দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি পেতে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবা প্রত্যাশীরা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে প্রয়োজনীয় নথি হাতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সম্প্রতি এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নকলনবীশ টুটুলের নাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অফিসটির ভেতরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নথি প্রস্তুত ও সরবরাহের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কোন ফাইল কত দ্রুত এগোবে এবং কে কত টাকা দিলে কাজ সম্পন্ন হবে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জমির দলিল, নকল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে এক ধরনের অঘোষিত ‘রেট তালিকা’ চালু রয়েছে। এই তালিকার বাইরে গিয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
অভিযোগ রয়েছে, নকলনবীশ টুটুল এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করেন। তার মাধ্যমে ফাইল আটকে রাখা, অযথা ত্রুটি দেখানো এবং দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বাধ্য করার মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ সময়মতো সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে রাজি হন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসে সরাসরি গেলে নানা অজুহাতে ঘুরানো হয়। পরে নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়—যার পেছনে অর্থ লেনদেনই মূল কারণ বলে দাবি তাদের।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থেকে টুটুলসহ সংশ্লিষ্টরা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে অফিসের ভেতরের কার্যক্রম কার্যত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই চক্রের কারণে সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে নকলনবীশ টুটুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাননি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জন্য জমি সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নকলনবীশ টুটুলসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই অনিয়মের চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে তারা সেবা প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং দালালমুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে—যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কেউই।
আপনার মতামত লিখুন :