
* স্টিল ব্রিজের নামে ৩ বছরের ভোগান্তি
* প্রকল্পের মেয়দ ৩ দফায় ৫ বছর বেড়েছে
* গল্লামারী ব্রিজের দুই পারে তীব্র যানজট
* ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চরম অব্যবস্থাপনা
দিলীপ বর্মণ, খুলনা: খুলনার অন্যতম প্রবেশদ্বার গল্লামারীর ময়ূর নদের উপর দৃষ্টিনন্দন স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চ ব্রিজের মূল স্ট্রাকচারের কাজ এগিয়ে চলছে। ব্রিজের দুই পারে অস্থায়ী পিলার ও স্প্যান বসানোর কাজ আগেই শুরু হয়েছে। এই অস্থায়ী স্প্যানের উপরেই স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চের সংযোগ স্থাপন করা হবে। মূল স্ট্রাকচার বসানোর পর অস্থায়ী স্প্যান সরানো হবে। আগামী জুন অথবা জুলাই মাসে একটি ব্রিজ দৃশ্যত হবে। তবে এই ব্রিজের নির্মাণ কাজের জন্য ৩ বছরের চরম ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী। দুই পারে তীব্র যানজটের কারণে খুলনাবাসী চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। একদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই) এর চরম অবস্থাপনা, অন্যদিকে গল্লামারী ব্রিজ সংলগ্ন সড়কের দুই পাশের অর্ধেক অংশে টিনের ঘেরবেড়া দিয়ে যানজট সৃষ্টি করা, বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ ৩ দফায় ৫ বছর বাড়িয়ে নেওয়া, বাজার সংলগ্ন রাস্তায় নির্মণ সামগ্রী রাখায় পচা বর্জ্যেের দুর্গন্ধে অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা। সবমিলে গল্লামারীর দৃষ্টিনন্দন স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চ ব্রিজ যেন জনভোগান্তির অন্য নাম।
গত এক মাস ধরে ব্রিজের পশ্চিম পাশে সড়কের উপর স্টিল স্ট্রকচার ইরেকশন বা সংযোজনের কাজ চলেছে। এই সেতুর স্ট্রাকচার তৈরিতে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ২৮৭ খণ্ডাংশ উন্নত মানের স্টিল এবং ২৮ দশমিক ৬৮ টন নাট বোল্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। যার প্রযুক্তিগত সহায়তায় রয়েছে ভারতের সন্দীপ গুহানি এন্ড অ্যাসোসিয়েটর্স। এই ব্রিজটি আগামী জুলাই মাসে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আর্চ স্টিল সেতুর মূল কাঠামো দেখতে কিছুটা ধনুকের মতো বাঁকা। দুই পাশে অ্যাব্যাটমেন্টের উপর আর্চ স্টিল সেতু দাঁড়িয়ে থাকে। আর্চ স্টিল সেতুকে শক্তিশালী করার জন্য টাইবার ব্যবহার করা হয়। এই সেতু শূধুমাত্র ঊলম্বভাবে চাপ বহন করে না, ববং অনুভূমিক চাপও নিতে পারে। এরফলে এটি অনেক বেশী শক্তিশালী, হালকা ও স্থিতিশীল হয়। মূল সড়ক থেকে প্রায় সাড়ে চার ফুট উঁচু হবে সেতুর স্টিল স্ট্রাকচার। স্টিলের খণ্ডাংশগুলো একত্রীকরণ বা এসেম্বলির জন্য সেতুর পশ্চিম পাশে সড়কের উপর সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ৮০ মিটার লম্বা বালির বেড নির্মাণ করা হয়েছে। এর উপর স্টিলের খন্ডাংশগুলো একত্রীকরণ বা সংযোজনের কাজ চলছে। সংযোজনকৃত ব্রিজের সম্পূর্ণ স্টিল স্ট্রাকচারটি হাইড্রোলিক জ্যাক বা শক্তিশালী কপিকলের মাধ্যমে নদীর উপর নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করা হবে। তারপর অস্থায়ী পিলার ও স্প্যান সরানো হবে।
প্রকল্প সূত্রে আরও জানা গেছে, সড়ক বিভাগ স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চ ব্রিজের এটিই প্রথম কাজ। এবিষয়ে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত কোন প্রশিক্ষণ নেই। ব্যয় কমানোর জন্য চায়না প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতীয় কনসালটেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে। এই ব্রিজের সরঞ্জাম জুড়তে ব্যয় হচ্ছে ২ কোটি টাকা ও বিভিন্ন কাজে টর্করেঞ্জ, পলিমার ইপোক্সি কালার ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া গত বছর বৃষ্টির কারণে স্পে করতে অনেক সমস্যা হয়েছে। সব মিলে ব্রিজর নির্মাণে সময় বেশী লাগছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজের দুই পারে অ্যাব্যাটমেন্টের উপর মূল সেতুর স্টিল স্ট্রাকচারগুলো স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মাঝখানে অস্থানী পিলারের উপর স্প্যান বসানোর কাজ চলছে। বালির বেডের উপর স্টিলের খন্ডাংশগুলো একত্রীকরণ বা সংযোজনের কাজ চলছে। প্রকল্পের ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার অপূর্ব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি হচ্ছে। ব্রিজটি দৃশ্যমান হওয়ার আগে অনেকগুলো কাজ চলমান ছিল। স্টিল স্ট্রাকচারের সম্পূর্ণ মালামাল দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়েছে। আমাদের খুব সতর্কতার সাথে কাজগুলো করতে হচ্ছে। আশা করি জুন মাসে সেতুর স্টিল স্টাকচার দৃশ্যমান হবে। জুলাই মাসে যানবাহন চলাচলের টার্গেট নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক জানিয়েছেন, ‘অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে অবশেষে শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই ব্রিজটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। নানাবিধ কারণে এই প্রকল্পটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, প্রথমে নির্মাণ ব্যয়ের সাথে প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরী হয়। তারপর বিদেশীদের সহায়তায় কাজ শুরু করা হয়। আশাকরি জুলাই মাসে একটি ব্রিজ চালু করতে পরবো। এরপর আর একটির কাজ শুরু হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গল্লামারী মযূর নদের উপর হাতিরঝিলের আলোকে দৃষ্টিনন্দন স্টিল নেটওয়ার্ক আর্চের ২টি ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা করে খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর নতুন ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে পুরাতন সেতুটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রিজ দুইটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর কাজ স্থগিত থাকে। পূর্বের প্রযুক্তিগত মতানৈক্য, নির্মাণ ব্যয়ের তারতম্য ও ডিজাইন সংক্রান্ত সমস্যার সাথে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তনের সমস্যা, দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং চায়না প্রযুক্তির কাজে ভারতীয় কনসালটেন্ট নিয়োগে জটিলতার কারণে বহুমুখী সমস্যার অন্তরালে চাপা পড়ে এই ব্রিজের কাজ। এরপর খুলনা সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের রদবদল হয়। ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. তানিমূল হক যোগদানের পর আলোর মুখ দেখে গল্লামারী ব্রিজ। খুলনা সড়ক বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দফায়-দফায় বৈঠকের পর নতুন করে কাজ শুরু হয়। প্রথমে পাশপাশি দুইটি ব্রিজের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬৮ কোটি টাকা কিন্তু ব্যয় বেশী হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করে ৮২ কোটি টাকা। পরে বহু হিসাব নিকাশ করে দুইটি ব্রিজের ব্যয় ৭৪ কোটিতে রাখা হয়। এখন আরও ব্যয় বাড়বে বলে জানোনো হয়েছে। গত বছর প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এখন তা আরও বাড়ানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিকূলতা কাটিয়ে একটি ব্রিজ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে নগরবাসী।
আপনার মতামত লিখুন :