
ভোটের মাত্র ১২ দিন আগে ইসির এই হঠাৎ অবস্থানে সরকারের উচ্চ মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, তাদের অন্ধকারে রেখেই ইসি এমন নির্দেশনা জারি করেছে। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ের প্রায় সব সরকারি কর্মকর্তা ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইসির এই নির্দেশনা কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর থেকেই সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছেন। সরকার এই প্রচারের জন্য ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং ব্যাংক-বিমাসহ সব সরকারি দপ্তরে ব্যানার-বিলবোর্ড শোভা পাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন সব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করেছে যে, প্রজাতন্ত্রের কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে পারলেও ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানাতে পারবেন না। কমিশনের মতে, এটি গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২১ ধারা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ৮৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদের অপব্যবহার করে ফলাফল প্রভাবিত করলে দোষী ব্যক্তিকে ১ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হতে পারে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সরকারি কর্মকর্তারা যাতে আর প্রচারে না নামেন, তা নিশ্চিত করতেই এই চিঠি। তবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা সরকারি কর্মচারী নন বিধায় তারা প্রচার চালাতে পারবেন।
সারা দেশে ঝোলানো ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের বিষয়ে ইসির চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, এসব প্রচারসামগ্রী কারা লাগিয়েছে তা ইসির জানা নেই। এগুলো রাখা বা সরানোর সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকেই নিতে হবে। ইসির এই সিদ্ধান্তে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল ক্ষুব্ধ। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, তারা ইসির চিঠি পেয়েছেন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাবেন। সূত্রমতে, সরকার প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারির চিন্তাভাবনা করছে। তবে তার আগে সিইসির সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এবারের গণভোটে ভোটারদের একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত দিতে হবে: ১. জুলাই সনদের আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন। ২. ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের বাধ্যবাধকতা।৩. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন। ৪. রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার সম্পন্ন করা।
নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তাদের গণভোটের প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিলেও সরকার তার অবস্থানে অনড়। আইনের প্রয়োগ বনাম সরকারি প্রচারণার এই দ্বন্দ্বে ভোটের মাঠ এখন সরগরম। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই বা আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আপনার মতামত লিখুন :