
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির ডান পায়ের হাঁটুর অংশে ছররা গুলির আঘাত লেগেছে। ক্ষতস্থানে গভীর জখম রয়েছে। বর্তমানে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচার করা হতে পারে। তবে আপাতত তার জীবনহানির আশঙ্কা নেই। ফাহিমের মা জোসনা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে কোনো ঝামেলার সঙ্গে জড়িত ছিলো না। সে শুধু রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায়। আমরা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ফাহিম স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে নিয়মিত পড়াশোনা করে এবং পরিবারের আশা ছিল ভবিষ্যতে বড় হয়ে ভালো মানুষ হবে। কিন্তু এলাকার সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষে নিরপরাধ এই শিশুটি এখন হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। এই সংঘর্ষে ফাহিম ছাড়াও মুহাম্মদ হাসান, জসিম ও ইসমাইল মিয়া নামের আরও তিনজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে ছররা গুলির আঘাত রয়েছে বলে জানা যায়। আহতদের কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোলাগুলির সময় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ দিকবিদিক ছুটতে থাকে। অনেকেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে আশ্রয় নেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী মোরশেদ খানের অনুসারীদের সঙ্গে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী আব্দুস সোবাহান ও শওকতের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছিলো। এই বিরোধের জের ধরেই শনিবার রাতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের সময় সন্ত্রাসীরা ছররা গুলি ছোড়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। তবে প্রতিপক্ষের বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও সাধারণ মানুষ এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, ময়দারমিল এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়েছে। এই ঘটনায় একটি শিশু গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করেছি। জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগর পুলিশের করা ৩০০ দুষ্কৃতকারীর তালিকায় সন্ত্রাসী মোরশেদ খানের নাম রয়েছে। তিনি এলাকায় নিজেকে রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। এলাকায় ফিরে আসার পর তার প্রতিপক্ষ সোবাহান ও শওকতের অনুসারীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে তাকে মারধর করে এলাকা ছাড়তেও বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনার জের ধরেই মোরশেদ খানের অনুসারীরা প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া বলেন, গোলাগুলির ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তির বাসা থেকে একটি শর্টগান ও দুটি কার্তুজ উদ্ধার করেছে। তবে অভিযানের খবর পেয়ে সে পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এর আগেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ময়দারমিল এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত কয়েকদিন ধরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। প্রায়ই সন্ত্রাসীদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছিলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এলাকায় এখন সন্ত্রাসীদের দাপট বেড়ে গিয়েছে। তারা গ্যাং তৈরি করে আধিপত্য বিস্তার করছে। সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে না। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক। নিরীহ মানুষ যেন আর এমন ঘটনার শিকার না হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। কেউ যদি দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্ম করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা বলেন,দেশ ও দলের স্বার্থে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এলাকাবাসীর দাবি, ময়দারমিল এলাকায় দ্রুত স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এলাকায় কিছু সন্ত্রাসী চক্র গড়ে উঠেছে যারা নিজেদের মধ্যে গ্যাং তৈরি করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এতে নিরীহ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। এদিকে শিশুটির পরিবার ও স্থানীয়রা আশা করছেন, দ্রুত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের গ্রেফতার করা হবে এবং এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :