
চিকিৎসকদের মতে, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে গর্ভধারণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি কোনো রোগের নাম নয়; বরং গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি বোঝাতেই এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।
বয়স বাড়লে কোন ঝুঁকি বাড়ে
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আকলিমা জাকিয়া জিনান জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই নানা পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে বয়সের সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যাওয়ায় গর্ভাবস্থায় কিছু জটিলতার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
৩৫ বছরের পর গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ৪৫ বছরের পর এ ঝুঁকি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এ ছাড়া গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া, গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা এবং সময়ের আগে সন্তান জন্মের মতো জটিলতার আশঙ্কাও তুলনামূলক বেশি থাকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণ করলেই জটিলতা দেখা দেবে। অনেক নারী ৩০-এর শেষ ভাগ কিংবা ৪০-এর শুরুতেও স্বাভাবিক গর্ভাবস্থা পার করে সুস্থ সন্তান জন্ম দেন। মায়ের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, আগে থেকে থাকা কোনো রোগ, জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়গুলোও গর্ভাবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
গর্ভধারণের আগে প্রস্তুতি জরুরি
৩৫ বছরের পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে গর্ভধারণের আগেই একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এতে শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন, আগে থেকে থাকা কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকেও সচেতন থাকা জরুরি। প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, শাকসবজি ও ফলমূলসহ সুষম খাবার মায়ের পাশাপাশি অনাগত শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় এবং নিয়মিত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাস কমানো উচিত। এসব অভ্যাস গর্ভকালীন ডায়াবেটিসসহ কিছু জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হাঁটা ও ব্যায়ামেও উপকার
গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে হালকা ব্যায়াম বা নিয়মিত হাঁটা উপকারী হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটা শরীর ও মনকে কিছুটা স্বস্তি দিতে এবং ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম রক্তসঞ্চালন ভালো রাখতে এবং গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো ধরনের ব্যায়াম শুরু করার আগে ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর
৩৫ বছরের পর সন্তান নেওয়ার বিষয়ে সামাজিক চাপ, বয়স নিয়ে উদ্বেগ কিংবা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ নিয়ে ভয় অনেক নারীর মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম, হালকা শারীরিক কার্যক্রম, পরিবারের সহযোগিতা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানসিকভাবে ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করতে পারে।
টিকা ও নিয়মিত চিকিৎসা
গর্ভধারণের আগে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়ার বিষয়টিও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। সবার জন্য একই ধরনের টিকা প্রয়োজন হয় না। ব্যক্তির পূর্বের রোগের ইতিহাস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় টিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে না দেখে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়া। বয়স কিছু ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু সুস্থ জীবনযাপন, গর্ভধারণের আগে প্রস্তুতি, নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সুস্থ গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই বজায় থাকে।
সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় খাদ্য, ব্যায়াম, ওষুধ বা টিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :