
একসময় নদীর মোহনা ও উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় সহজেই ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন অনেক জেলেকে মাছের সন্ধানে আরও গভীর সমুদ্রে যেতে হচ্ছে। এতে ছোট নৌকা ও সাধারণ জাল ব্যবহারকারী জেলেরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার একাধিক জেলের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আগের তুলনায় অগভীর উপকূলীয় এলাকায় ইলিশের উপস্থিতি কমেছে। গভীর সমুদ্রে মাছ থাকলেও সেখানে যেতে প্রয়োজন বড় নৌকা, উন্নত সরঞ্জাম ও বাড়তি খরচ। ফলে অনেক ক্ষুদ্র জেলে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরতে পারছেন না।
ইলিশের উৎপাদনের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। পরবর্তী দুই বছরে উৎপাদন প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে। ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জেলেদের ইলিশ আহরণ প্রায় ৪৫ শতাংশ কম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীপথে বাড়ছে বাধা
ইলিশের জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নদীর সঙ্গে যুক্ত। প্রজননের জন্য সাগর থেকে ইলিশ নদীর মিঠাপানির দিকে আসে। তাই নদীর পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা কমে গেলে মাছের স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গবেষকদের মতে, পদ্মাসহ বিভিন্ন নদীতে পানিপ্রবাহের পরিবর্তন ও অতিরিক্ত পলি জমা ইলিশের চলাচলের পথ সংকুচিত করছে। মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনা ও আশপাশের নদীতে ইলিশের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এমন ১৭টি স্থান চিহ্নিত করেছে মৎস্য অধিদপ্তরের একটি জরিপ। এর মধ্যে ১৪টি মেঘনা নদীতে।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনও ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। বৃষ্টিপাত, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ ও সাগরের স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে ইলিশের চলাচল ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
সংকটে জেলেদের জীবিকা
ইলিশ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু মাছের বাজারে নয়, সরাসরি পড়ছে জেলেদের জীবন-জীবিকায়। মাছ ধরতে গিয়ে প্রত্যাশিত আয় না হলে নৌকা, জ্বালানি, বরফ ও খাবারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জেলে ধারদেনা করে মাছ ধরতে গিয়ে কম আহরণ হলে আরও ঋণের চাপে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই ইলিশের সংকট পুরোপুরি সমাধান হবে না। নদীর পানিপ্রবাহ ও ইলিশের চলাচলের পথ স্বাভাবিক রাখা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি বন্ধ এবং আইন কার্যকর করার পাশাপাশি জেলেদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় নদী, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ এবং মাছের জীবনচক্র নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :