শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আজিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ


এম এস শবনম শাহীন প্রকাশের সময় : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২১ অপরাহ্ণ ৭৬
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আজিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

সরকারি দপ্তরে একটি পদ শুধু পদবি নয়—এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দায়িত্ব, দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সুযোগ। সেই সুযোগ ব্যবহার করে কেউ যদি নিয়মের বাইরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখায় কর্মরত মো. আজিজ উদ্দিন মিয়াজীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন এমনই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। টেন্ডার ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে কথিত প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে হস্তক্ষেপ, জেলা পর্যায়ের আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব, পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। আর এসব অভিযোগের পেছনে বাস্তব কোনো দাপ্তরিক ও আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা জানতে প্রয়োজন নথির গভীর পর্যালোচনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আজিজ উদ্দিন মিয়াজী বর্তমানে ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি’র সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব ও হস্তক্ষেপ ছিল। পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার-সংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়েও সে সময় অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আলোচনা ছিল বলে দাবি সূত্রগুলোর।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ওই সময় ঠিকাদারি লাইসেন্স বাণিজ্য, নামে-বেনামে লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, জেলা কার্যালয় থেকে অর্থ উত্তোলনসংক্রান্ত কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর বিরুদ্ধে। সূত্রগুলোর দাবি, তাঁর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতেন।

আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তাঁর বর্তমান পদের বৈধতা এবং অনুমোদিত পদ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। নিয়োগবিধি ও অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী তিনি ওই পদে থাকার যোগ্য কি না, তা নিয়েও অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে বিষয়টির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

‎এদিকে আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর সম্পদ অর্জন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তাঁর নিজ জেলা কুমিল্লায় নিজ নামে ও বেনামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি থাকার কথাও বলা হচ্ছে। চাকরিজীবনের আয় ও দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস কী—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

লাখোকণ্ঠের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ডেমরা ও মতিঝিল এলাকায় আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর নামে থাকা জমি, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ডেমরার দেইল্লা-৩৬ মৌজা এবং মতিঝিলের দনিয়া-৩০ মৌজায় থাকা সম্পত্তির বিষয়ে দলিল, খতিয়ানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মালিকানাসংক্রান্ত নথিপত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এসব নথিপত্রে সরাসরি আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর নাম রয়েছে। নথিগুলো পর্যালোচনায় সম্পত্তিগুলোর অবস্থান ও মালিকানার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সঙ্গে এসব সম্পত্তির ক্রয়মূল্য, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস কী ছিল—তা নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।

‎তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি তাঁর সম্পদের পুরো চিত্র নয়; বরং দৃশ্যমান সম্পদের একটি অংশমাত্র। নথিপত্রে পাওয়া সম্পদের বাইরেও তাঁর নামে বা বেনামে আরও কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সার্বিক মন্তব্য জানতে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আজিজ উদ্দিন মিয়াজীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে-বার্তার মাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়। এমনকি পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‎আজিজ উদ্দিন মিয়াজীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের পরিধি বেশ বিস্তৃত। টেন্ডার ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে হস্তক্ষেপ, পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মতো অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি ও দাপ্তরিক রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্যের মধ্যে সম্পদ-সংক্রান্ত কিছু দলিল ও খতিয়ান রয়েছে, যা রাজধানীর ডেমরা ও মতিঝিল এলাকায় তাঁর নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তির বিষয়ে অনুসন্ধানের ভিত্তি তৈরি করেছে।

‎অন্যদিকে টেন্ডার, ঠিকাদারি কার্যক্রম, লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ কিংবা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদকের হাতে কোনো টেন্ডার-সংক্রান্ত নথি বা সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ ও দাবির ভিত্তিতে সামনে এসেছে। ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, বরং যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়ার রেকর্ড, দায়িত্ব অর্পণের আদেশ এবং আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে এসব অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০