জিন্নাহর ঢাকা সফর ও ভাষা আন্দোলনের সেই দশ দিন


বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা প্রকাশের সময় : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ণ ১৭
জিন্নাহর ঢাকা সফর ও ভাষা আন্দোলনের সেই দশ দিন

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে এটি ছিল তাঁর প্রথম এবং শেষ সফর। প্রায় ১০ দিনের এই সফরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। তবে ভাষা নিয়ে তাঁর অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সফরটির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।

জিন্নাহ ঢাকায় আসার আগেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও সংঘর্ষের পরিস্থিতিতে তাঁর সফর ঘিরে মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—তিনি হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষার দাবিকে গুরুত্ব দেবেন। কিন্তু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর অবস্থান সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দেয়।

জিন্নাহকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজন

জিন্নাহর সফর উপলক্ষে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। তাঁকে স্বাগত জানাতে গঠিত হয় বিশেষ অভ্যর্থনা কমিটি। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অর্ধশতাধিক তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, পাকিস্তানের পতাকা ও জিন্নাহর ছবি টানানোসহ নানা আয়োজন করা হয়। রেসকোর্স ময়দানে জনসভার জন্য বড় মঞ্চ, স্বেচ্ছাসেবক দল, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাকেন্দ্রও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

১৯ মার্চ সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানে করাচি থেকে ঢাকায় পৌঁছান জিন্নাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোন ফাতেমা জিন্নাহ। তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে তাঁকে স্বাগত জানান পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বৃষ্টির মধ্যেও বিমানবন্দর এলাকায় ব্যাপক মানুষের সমাগম হয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথম বৈঠক

ঢাকায় আসার পরদিন সেনানিবাসের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জিন্নাহ। একই দিন সন্ধ্যায় ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় না এলেও ছাত্রনেতা মোহাম্মদ তোয়াহা জিন্নাহর হাতে ভাষা সমস্যা নিয়ে একটি স্মারকলিপি দেন।

পরবর্তী সময়ে মুসলিম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন জিন্নাহ। সেখানে তিনি তাদের মধ্যে বিরোধ দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

রেসকোর্সে ‘উর্দুই রাষ্ট্রভাষা’

২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় জিন্নাহ প্রায় এক ঘণ্টা বক্তব্য দেন। ভাষণজুড়ে তিনি ভাষা আন্দোলনের সমালোচনা করে স্পষ্ট করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।

তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই প্রতিবাদ জানান। জনসভায় ‘না, না’ ধ্বনি ওঠে এবং কিছু সময়ের জন্য হট্টগোল সৃষ্টি হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ভাষা প্রশ্নে জিন্নাহ ও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ

২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনে আবারও রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন জিন্নাহ। তিনি বলেন, প্রদেশের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।

তাঁর বক্তব্যের সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ‘না, না’ বলে প্রতিবাদ করেন। ভাষাসৈনিকদের একটি অংশ আগে থেকেই এ ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলে গবেষণাগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে উত্তপ্ত বৈঠক

সেদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন জিন্নাহ। প্রতিনিধিরা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানালে আলোচনা একপর্যায়ে তর্কাতর্কিতে রূপ নেয়।

ভাষা আন্দোলনের নেতারা একাধিক রাষ্ট্রভাষার পক্ষে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরেন। জিন্নাহ অবশ্য পাকিস্তানের জন্য একক রাষ্ট্রভাষার অবস্থানেই অনড় থাকেন। বৈঠকে একপর্যায়ে উত্তেজনাও তৈরি হয়।

ফাতেমা জিন্নাহর বেতার ভাষণ

২৪ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের উদ্দেশে ঢাকা বেতারে ভাষণ দেন ফাতেমা জিন্নাহ। পাকিস্তানের অগ্রগতিতে নারীদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

চট্টগ্রাম সফর

২৫ মার্চ চট্টগ্রামে যান জিন্নাহ। সেখানেও তাঁর আগমন উপলক্ষে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। পতেঙ্গা থেকে গভর্নমেন্ট হাউজ পর্যন্ত পথে অসংখ্য তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেন এবং বন্দর সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

পরদিন পুলিশ লাইনস মাঠের সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দেন জিন্নাহ। সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কর্ণফুলী নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বিদায় ভাষণেও ভাষা প্রসঙ্গ

২৮ মার্চ করাচি যাওয়ার আগে রেডিও পাকিস্তারে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন জিন্নাহ। সেখানেও ভাষা আন্দোলনের সমালোচনা করেন তিনি এবং পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। ভাষা আন্দোলনের পেছনে ভারতের প্রভাব থাকার সন্দেহের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

তবে জিন্নাহর অবস্থান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামাতে পারেনি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকে নিহত হন। এর পর ভাষা আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০