
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপদ পানির উৎসের সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় ঝিরি-ঝরনা কিংবা দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। নতুন এসব ব্যবস্থার ফলে দুর্গম এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
পৌর এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই ও সমন্বিত পৌর পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত।
প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান পৌর এলাকায় ৬৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট নির্মাণ, ৮৬৭টি টয়লেট উন্নয়ন, পাঁচটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং আটটি পাবলিক টয়লেট সংস্কার করা হচ্ছে। একই প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান ও লামা পৌরসভায় প্রায় ২০০টি টয়লেট নির্মাণ ও সংস্কারের কাজও চলছে। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নিম্নআয়ের পরিবারসহ পৌর এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা বাড়বে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর শৌচাগারের ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ছিল না। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ সমস্যায় পড়তে হতো। নতুন টয়লেট নির্মাণ ও পুরোনো স্থাপনা সংস্কারের ফলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমেছে।
সিদ্দিকনগরের বাসিন্দা সাগর বলেন, নতুন স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় স্থানীয়রা উপকৃত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের কারণে এলাকার পরিবেশও আগের তুলনায় পরিচ্ছন্ন থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাফেজঘোনার বাসিন্দা কামাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট ছিল। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ কমছে।
সাত উপজেলায় ৪৫ কোটি টাকার পানি-স্যানিটেশন প্রকল্প
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বান্দরবানের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে। ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় জেলার সাত উপজেলা—বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়িতে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পুরোনো ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত এবং নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫৮৩টি রিংওয়েল, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, ৫০টি গভীর নলকূপ এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহের জন্য ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য এসব উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও আবার ঝিরি-ঝরনা বা অন্যান্য অনিরাপদ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর ফলে এসব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমছে।
তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারের সভাপতি মংক্য প্রু মার্মা বলেন, আগে নিরাপদ পানির জন্য স্থানীয়দের অনেক দূরে যেতে হতো। এখন পানি সরবরাহের ব্যবস্থা হওয়ায় মানুষের সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
রোয়াজা পাড়ার ৬৫ বছর বয়সী হ্নাক্রা মার্মা বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এলাকায় পানির ব্যবস্থা হওয়ায় বয়স্ক মানুষসহ পুরো এলাকার বাসিন্দারা উপকৃত হচ্ছেন।
ডংখিংঅং পাড়ার ইয়য়নু মারমা বলেন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট মানুষের জীবন সহজ করার পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করবে।
যৌথ খামার এলাকার বাসিন্দা তিতিউ মার্মার মতে, পাহাড়ি এলাকায় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। নতুন পানির উৎস ও স্যানিটেশন সুবিধা চালু হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও গুরুত্ব
বান্দরবানের দুর্গম এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির সহজলভ্যতা কম হওয়ায় রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় এটি সহায়ক হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় টিএন্ডটি পাড়া, হাফেজঘোনা, নিউগুলসান, হাসপাতাল এলাকা, সিদ্দিকনগর, সুয়ালক ও হলুদিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের পানির দুর্ভোগ কমাতে চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় টিউবওয়েল, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও জিএফএস স্থাপন করা হয়েছে। আরও দুর্গম এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বান্দরবানের মতো পাহাড়ি জেলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনমান সরাসরি জড়িত।
দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে শহর ও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়লেও এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করাকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তা সম্ভব হলে সরকারি বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :