মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি :সিলেটের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা একসময় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে অনন্য ভূমিকা পালন করত।
বিস্তীর্ণ চা-বাগান, হাকালুকি হাওরের বিপুল মৎস্যভাণ্ডার এবং প্রবাসী আয়ের প্রাচুর্য এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছিল। তবে সময়ের আবর্তে এসে দাঁড়িয়েছে এক নির্মম বাস্তবতায়। দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই উন্নয়ন না হওয়ায় অঞ্চলটি যেন স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রতিদিন বাড়ছে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত যুবকের সংখ্যা, কিন্তু সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। ফলে একদিকে যেমন অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে কুলাউড়া, অন্যদিকে কর্মহীন যুবসমাজের মধ্যে বাড়ছে চরম হতাশা। স্থানীয় সচেতন মহল এবং ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই আজ কুলাউড়া তার গৌরব হারাতে বসেছে।
অবকাঠামোগত স্থবিরতা: দৃশ্যমান উন্নয়নের অন্তরায়
উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো উন্নত যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো। কিন্তু কুলাউড়া পৌরসভা থেকে শুরু করে ১৩টি ইউনিয়নের ভেতরের সড়কগুলোর দিকে তাকালে উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
ভাঙাচোরা সড়ক ও যানজট: কুলাউড়ার প্রধান সড়কসহ গ্রামীণ রাস্তাগুলোর অধিকাংশেরই বেহাল দশা। সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হয় কৃত্রিম বন্যা। পৌর এলাকার ভেতরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ময়লা পানি রাস্তায় উপচে পড়ে। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ধুলোবালি ও যানজট এখন নিত্যদিনের সঙ্গী।
রেলওয়ে জংশনের জীর্ণ দশা: ঐতিহাসিক কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনটি একসময় অত্যন্ত জমজমাট ছিল। বর্তমানে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে আছে। স্টেশনের আধুনিকায়ন ও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি, যা এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নাজুক অবস্থা: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হলেও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শূন্যতার কারণে সাধারণ মানুষকে জেলা শহর বা সিলেটে ছুটতে হয়। গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ভবন ও আধুনিক ল্যাবরেটরি নেই।
কুলাউড়ায় দৃশ্যমান উন্নয়ন না থাকার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো নতুন কোনো ভারী বা মাঝারি শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠা। উল্টো অতীতে সচল থাকা বিভিন্ন ছোট-বড় কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বিসিক শিল্পনগরীর অনুপস্থিতি: কুলাউড়ায় কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পনগরী (বিসিক) গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা নতুন কোনো শিল্প বা কারখানা স্থাপনে সাহস পাচ্ছেন না। ব্যাংকিং ঋণ পাওয়ার জটিলতাও কুটির শিল্প বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
চা-শিল্পের সংকট ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা
কুলাউড়া উপজেলার অর্থনীতির একটা অংশ চা-বাগানের ওপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমান সময়ে চা-শিল্প চরম মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মজুরি বৈষম্য ও ছাঁটাই: চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। বাগানগুলোতে নতুন করে স্থায়ী নিয়োগ প্রায় বন্ধ। খরচ কমাতে অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী বা ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করছে, যার ফলে স্থানীয় তরুণরা এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
চা-বাগানের শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্ব: চা-শ্রমিকদের নতুন প্রজন্ম এখন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু বাগানগুলোতে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী দাপ্তরিক বা টেকনিক্যাল কাজের সুযোগ সীমিত। মূল ধারার অর্থনীতিতেও তাদের প্রবেশাধিকার সহজ না হওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী বেকারত্বের অভিশাপ বইছে।
এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওরের একটি বড় অংশ কুলাউড়ায় অবস্থিত। পর্যটন ও মৎস্য চাষের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই হাওর অঞ্চল অবহেলিত।
পর্যটনের স্থায়ী পরিকাঠামো নেই: হাকালুকি হাওরকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। ওয়াচ টাওয়ার, উন্নত মানের হোটেল-মোটেল এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে প্রতি বছর লাখো পর্যটক আসত। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান হতো।
মৎস্য সম্পদের বিপর্যয়: ইজারা প্রথার জটিলতা, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার এবং অভয়াশ্রমের অভাবে হাওরের দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। ফলে বংশানুক্রমিকভাবে যারা মাছ ধরার পেশায় জড়িত ছিল, তারা এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
বেকারত্বের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ ও যুবসমাজের হতাশা
কুলাউড়ায় প্রতি বছর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। কর্মসংস্থানের বাজার সংকুচিত হওয়ায় তারা কোনো কাজ পাচ্ছে না।
শিক্ষিত বেকারত্ব: সাধারণ শিক্ষায় ডিগ্রিধারী তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে কোনো অফিস, ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে। কারিগরি শিক্ষার অভাবের কারণে তারা আধুনিক কর্মসংস্থানের উপযোগী হয়ে উঠতে পারছে না।
উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাধা: অনেক তরুণ চাকরি না পেয়ে নিজেই ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে চায়। কিন্তু চড়া সুদের ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির জটিলতা এবং বাজারের মন্দাভাবের কারণে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন শুরুতেই ভেস্তে যায়।
সামাজিক অবক্ষয় ও মাদকাসক্তি: দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে যুবসমাজের মধ্যে তীব্র মানসিক হতাশা তৈরি হচ্ছে। এই হতাশাকে পুঁজি করে একটি চক্র যুবকদের মাদকের অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মূল কারণ কর্মহীনতা।
রেমিট্যান্সের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা ও এর নেতিবাচক প্রভাব
কুলাউড়ার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে এই অতি-নির্ভরশীলতা স্থানীয় উৎপাদনশীল খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
স্থায়িত্বহীন প্রবাসী আয়: মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং ভিসা জটিলতার কারণে এখন আগের মতো মানুষ সহজে বিদেশে যেতে পারছে না। যারা যাচ্ছে, তারাও অনেকে প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরছে।
স্থানীয় বিনিয়োগে অনীহা: প্রবাসীদের উপার্জিত টাকা দিয়ে কুলাউড়ায় কেবল বড় বড় বহুতল বাণিজ্যিক ভবন বা বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন কোনো উৎপাদনমুখী শিল্পে প্রবাসীরা বিনিয়োগ করছেন না। ফলে ভবনগুলো ফাঁকা পড়ে থাকছে এবং স্থানীয় বেকারত্ব কমছে না।
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নাগরিক ক্ষোভ
স্থানীয় জনগণের মতে, কুলাউড়ার এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট।
সমন্বয়ের অভাব: উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মধ্যে সমন্বিত কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা নেই। টুকরো টুকরো এবং অপরিকল্পিত বরাদ্দ দিয়ে রাস্তাঘাটের ক্ষণস্থায়ী সংস্কার করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না।
বাজেট ও বরাদ্দের ঘাটতি: অন্যান্য উপজেলার তুলনায় কুলাউড়ায় বড় ধরনের মেগা প্রকল্প বা বিশেষ সরকারি বরাদ্দ আনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
কুলাউড়াকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও বেকারত্বমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা: কুলাউড়ায় সরকারি উদ্যোগে একটি বিসিক শিল্পনগরী বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র কলকারখানা স্থাপনের সুযোগ থাকবে।
পর্যটন খাতের আধুনিকায়ন: হাকালুকি হাওর ও চা-বাগানগুলোকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। এতে স্থানীয় গাইড, পরিবহন ও সেবা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
কারিগরি ও আইটি শিক্ষার প্রসার: প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় যুবকদের তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ফ্রিল্যান্সিং এবং বিভিন্ন কারিগরি ট্রেডে দক্ষ করে তুলতে হবে। কুলাউড়ায় একটি হাই-টেক পার্ক বা আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা: তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন এবং স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কুটির শিল্প, ডেইরি ফার্ম বা মৎস্য চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ দ্রুত চালু করা এবং উপজেলার অভ্যন্তরীণ প্রধান সড়কগুলো চার লেনে উন্নীত করে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
কুলাউড়ার উন্নয়ন কেবল কিছু দালানকোঠা বা পিচঢালা রাস্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন এখানকার প্রতিটি কর্মক্ষম হাত কাজ পাবে।
বেকারত্বের এই ভয়াবহ হার বজায় থাকলে অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। তাই আর কালক্ষেপণ না করে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রবাসী সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। কুলাউড়ার সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই হোক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
আপনার মতামত লিখুন :