
লাখোকন্ঠ অনলাইন ডেস্ক :আইনজীবীদের ফি’র কোনো লাগাম নেই, মুহুরিদের দৌরাত্ম্য তুঙ্গে আদালতে মামলা লড়তে গিয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে আইনজীবীদের ফি এবং তাদের সহকারীদের (মুহুরি) অতিরিক্ত টাকা দাবির কারণে।
মৌলভীবাজার আদালতে মামলার ধরনভেদে আইনজীবীদের নির্দিষ্ট কোনো ফি কাঠামো নেই। একই অপরাধ বা দেওয়ানি মামলার জন্য একেক আইনজীবী একেক রকম ফি দাবি করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মক্কেলের আর্থিক অবস্থা দেখে ফি নির্ধারণ করা হয়, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় আইনজীবীদের মুহুরিদের কারণে।
ওকালতনামা সই, হাজিরা দেওয়া, নকল তোলা বা জামিনের কাগজ প্রস্তুত করার নামে মুহুরিরা মক্কেলদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা বা মামলার ডেট (তারিখ) নষ্ট করার ভয় দেখানো হয়।
আদালতের প্রশাসনিক শাখার এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জিআর শাখা, নকল শাখা এবং পেশকারদের টেবিলে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। মামলার শুনানির তারিখ এগিয়ে আনা বা পেছানো, জামিনের আদেশ জেলখানায় পাঠানো, কিংবা মামলার নথির সার্টিফাইড কপি তোলার প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট হারে ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ দিতে হয়। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকে ধুলোবালির নিচে, আর বিচারপ্রার্থীদের চত্বরে চত্বরে ঘুরে জুতো ক্ষয় করতে হয়।
আদালত চত্বরে কথা হয় কুলাউড়া উপজেলা থেকে আসা জমিজমা সংক্রান্ত মামলার আসামি ফাতেমা বেগমের সাথে তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,
“পাঁচ বছর ধরে এই আদালতে ঘুরছি। উকিল সাহেবের ফি দিতে দিতে ঘরের গরু-বাছুর সব বিক্রি করে দিয়েছি। মুহুরি সাহেব প্রতিদিন এসে বলেন—‘আজ বড় সাহেবের টেবিলের খরচ লাগবে, কাল কাগজের খরচ লাগবে’। টাকা না দিলে মামলার ডেট ঠিকমতো পড়ে না। আমরা গরিব মানুষ, আইনের মারপ্যাঁচ বুঝি না। কিন্তু টাকা দিতে দিতে আমরা এখন ফকির। সরকারের কি এসব দেখার কেউ নেই?”রাজনগর থেকে আসা আরেক ভুক্তভোগী দিনমজুর কবির মিয়া বলেন,”একটা মারামারির মামলায় জামিন নিতে এসেছিলাম। আইনজীবী ঠিক করার পর মুহুরি এসে বললেন, আদালতের বড় বাবুদের টাকা না দিলে আজ জামিন হবে না।
বাধ্য হয়ে ধার করে আনা পাঁচ হাজার টাকা তাদের হাতে দিতে হলো। এখানে পা রাখলেই শুধু টাকা আর টাকা। আমাদের পকেট শেষ, কিন্তু মামলা শেষ হয় না।”সচেতন নাগরিকদের দাবি ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ মৌলভীবাজারের সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই অনৈতিক অর্থ আদায় বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা উঠে যাবে। মামলার ধরন অনুযায়ী আইনজীবীদের একটি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ফি নির্ধারণ করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি আদালত চত্বরে মুহুরিদের লাইসেন্স যাচাই এবং তাদের কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলার ফাইলিং এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করলে কর্মচারীদের সরাসরি ক্যাশ টাকা লেনদেনের সুযোগ কমে যাবে, যা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি—আইন মন্ত্রণালয়ের ভিজিল্যান্স টিম যেন অনতিবিলম্বে মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঝটিকা অভিযান চালায় এবং এই অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনে। বিচার যেন কেনাবেচার পণ্য না হয়ে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হতে পারে, এটাই এখন মৌলভীবাজারবাসীর প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :