
সামরুজ্জামান (সামুন), কুষ্টিয়া:কুষ্টিয়া শহর সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে শিশুদের জিরো সাইজ থেকে শুরু করে ছয় মাসের শিশুদের অত্যাধুনিক মানের পোশাক তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে সমাজসেবায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অসহায়, বেকার, অস্বচ্ছল নারীরা। বিনা খরচে প্রশিক্ষণ শেষ করে সেখানেই কর্মসংস্থান পাওয়া নারীদের কাছে এ যেনো এক ভাগ্যের লটারীর মত। হয়ে উঠছেন একজন নারী উদ্দোক্তা। প্রতিমাসে আনুমানিক ৪ হাজার শিশুদের জিরো সাইজের পোশাক প্রস্তুত করছেন এই সমন্বয় পরিষদের আওতাধীন নারী শ্রমিকেরা।
সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদের অর্থায়নে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সেলাই এবং প্যাকেজিং সহ বাজারজাত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা পর্যন্ত প্রতিপিস পোশাক তৈরি করে ২০ টাকা করে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন নারী শ্রমিকেরা। শহর সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদের আওতাধীন কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়া এলাকায় অবস্থিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (অফিস-২) এ ৩ জন প্রশিক্ষক এবং মোট ১৩ জন নারী শ্রমিক প্রতিদিন শিশুদের পোশাক তৈরিতে কাজ করছেন।
প্রশিক্ষক যারা আছেন তারা উন্নত মানের কাপড় ডিজাইন করে সেগুলো কেটে দিচ্ছেন। আর সেই ডিজাইন রুপে কাটা কাপড়গুলো সেলাই করে, সেগুলোর বোতাম লাগিয়ে সম্পন্ন কাজ শেষ করে প্যাজেজিং করে বাজারজাত সম্পন্ন করে পিস প্রতি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন নারী শ্রমিকের উদ্দোক্তারা। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ টি করে পোশাক সেলাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতে পারে একজন নারী শ্রমিক। প্রতিদিন একজন কর্মী প্রায় ৪০০-৫০০ টাকা উপার্জন করতে পারছে। এতে একজন মহিলা কর্মী প্রতিমাসে প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা উপার্জন করতে পারছেন। স্বাবলম্বী হচ্ছেন অসহায়, গরীব ও বিধবা নারীরা। সারা বাংলাদেশে মোট ৮০ টির বেশি সমন্বয় পরিষদ রয়েছে। কিন্তু এই রকম ব্যাতিক্রম ধরনের উদ্যোগ কুষ্টিয়াতেই প্রথম নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে এই কার্যক্রম শুরু করেন কুষ্টিয়া শহর সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদ। প্রথমে পায়ে চালানো সেলাই মেশিন দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করলেও এখন প্রায় ১২টি ডিজিটাল সেলাই মেশিনে এই কাজগুলো করছেন নারী শ্রমীকেরা। তাদের এই নতুন ডিজাইনের পোশাকের চাহিদা এখন দিন দিন বেড়ে যাওয়ার কারনে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থা থেকে পোশাকের অর্ডার পাচ্ছেন তারা। চলতি মাসে সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক থেকে ৬ হাজার ৯ শত ১৭ পিস পোশাকের অর্ডার পেয়েছেন তারা। এর আগে ৩ হাজার ৩ শত ৫৮ পিস পোশাক সেখানে দিয়েছিলেন তারা। এ ছাড়াও জাপান টোবাক্কো ইন্টারন্যাশনালের ২৪০ জন চাষী পরিবারের নারীদের এই পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কুষ্টিয়া শহর সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদের প্রশিক্ষকেরা। প্রতি বছরে ২বার করে এই প্রশিক্ষণ হয় ৬ মাস পর পর। প্রথমত জানুয়ারি মাস থেকে জুন আর জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর মাস। প্রতি ৬ মাস পর পর ১০০ জন করে দুইবারে ২০০ জনকে এই পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ দেয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয় পরিষদ। আরও বেশি প্রশিক্ষণ কর্মশালা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা।
শহর সমাজসেবায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সেখানেই কর্মরত নারী উদ্দোক্তা রাফেজা ইসলাম বৈশাখী জানান, ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল এই কাজ শেখার। তারপর এখানে ভর্তি হয়েছি, এখান থেকে সম্পূর্ণ কাজ শিখেছি। প্রশিক্ষণ শেষে এখান থেকে আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছে। এখন এখান থেকে আমি প্রতিমাসে কাজ করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা ইনকাম করছি। আমি এখন নিজে থেকে স্বাবলম্বী। আর এখানে অনেক সেফটির সাথে থেকে কাজ করা যায়।
আরেকজন নারী শ্রমিক উদ্যোক্তা বলেন, আমার বাবা একজন কাটিং মিস্ত্রি বাবার কাছ থেকে অনেকটা শিখছি। বাবা অসুস্থ মা ও বিছানায় পড়ে আছে। আমাদের পারিবারিক অবস্থা খুবই খারাপ। অভাব অনটনের মধ্যে জীবন কাটছিলো। তখন আমি ভাবছিলাম কিছু একটা করবো। অনেক জায়গায় কাজের জন্য ছুটছিলাম কাজও পাচ্ছিলাম না। তারপর এক আন্টির মাধ্যমে এখানে আসি। এখানকার প্রশিক্ষক আপুরা খুবই ভালো। তারা আমাকে অনেক কাজ বুঝিয়ে দিয়েছে। আমি এখন কাজ করছি। আশা করি কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবো।
প্রধান প্রশিক্ষক হাসনা জাহান জানান, এখানে বিগত চার মাস যাবত সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কে আমরা অর্ডার পেয়েছি। প্রথমত আমরা ৬ জন নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ৬ জন থেকে এখন আমাদের বর্তমানে কর্মী আছে ১৩ জন। তার মধ্যে দশজন অফিসে কাজ করে এবং তিনজন বাড়িতে কাজ করে। এখানে প্রতি মাসে যারা কাজ করেছে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার টাকা আয় করতে সক্ষম হয়েছে। এরা কুষ্টিয়া শহর সমাজসেবা থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়েছে আবার এখানেই কাজের সুযোগ পেয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ৩০ জন মত কাজ করার মত সক্ষমতা আছে। আমাদের প্রশিক্ষণটাও চালু আছে পাশাপাশি পোশাক তৈরির কার্যক্রমও চালু আছে।
আপনার মতামত লিখুন :