জুলাইয়ের রাজপথে রুমি: মামলা-জেল পেরিয়ে আন্দোলনের সামনের সারিতে


আবুবকর সম্পদ, জবি প্রকাশের সময় : ২২ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ণ ৬৪
জুলাইয়ের রাজপথে রুমি: মামলা-জেল পেরিয়ে আন্দোলনের সামনের সারিতে

জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাজপথে যে কয়টি মুখ বারবার দেখা গেছে, তাঁদের অন্যতম রুমি। কখনো আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করা, কখনো আহতদের পাশে দাঁড়ানো, আবার কখনো পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়া—২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর উপস্থিতি ছিল ধারাবাহিক ও বলিষ্ঠ।

তবে রাজপথের এই লড়াই তাঁর জন্য নতুন কিছু ছিল না। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, ১৫টিরও বেশি মামলা, ছয়বার কারাবরণ এবং একাধিকবার হামলা-নির্যাতনের তিক্ত অভিজ্ঞতা সঙ্গী করেই তিনি সামিল হয়েছিলেন জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। বর্তমানে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন।

২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে প্রথম থেকেই এর পক্ষে অবস্থান নেন রুমি। একাধিক রাজনৈতিক মামলা থাকায় গ্রেপ্তারের ঝুঁকি এড়িয়ে শুরুতেই কৌশলগত অবস্থান নেন এবং সহযোদ্ধাদের যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। পরবর্তীতে ৭, ৮ ও ৯ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়ে রাজপথে দীর্ঘসময় অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের পানি ও স্যালাইন সরবরাহের দায়িত্ব নেন।

১১ জুলাই আন্দোলন আরও বেগবান হলে শাহবাগ অবরোধ কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জবি শিক্ষার্থীদের পুনর্সংগঠিত করেন রুমি। পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে আন্দোলনকারীদের শাহবাগে পৌঁছে দেন তিনি। সেদিনের মিছিলে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সরকারবিরোধী জোরালো স্লোগান রাজপথের উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আহতদের চিকিৎসাসেবায় মাঠে নামেন তিনি। পরদিন ১৬ জুলাই পল্টনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শেষে ক্যাম্পাসে ফিরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের মুখোমুখি হন। ওই দিনের সংঘর্ষে চার শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি রুমিও আহত হন।

১৯ জুলাই দেশজুড়ে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের পরও রাজপথ ছাড়েননি এই ছাত্রনেতা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে কারফিউ অমান্য করে আন্দোলনে নামেন। পুলিশ ও শাসক দলের সশস্ত্র হামলার মুখে চোখের সামনে একের পর এক প্রাণহানি দেখলেও পিছু হটেননি তিনি।

১৯ জুলাই রাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হলে বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যমে সহযোদ্ধাদের সংগঠিত রাখেন। দেশব্যাপী যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে তাঁকেও গ্রেপ্তারে একাধিকবার বাসায় অভিযান চালানো হয়, তবে কৌশলে আত্মগোপনে থেকে লড়াই চালিয়ে যান।

পরবর্তীতে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের ‘এক দফা’ দাবির ঐতিহাসিক সমাবেশ, ৪ আগস্টের অবস্থান কর্মসূচি এবং ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ৫ আগস্ট সকালে কেরানীগঞ্জ থেকে নাজিরাবাজার হয়ে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে ঢাকা মেডিকেল ও শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছান। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শাহবাগমুখী বিজয় মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে পুনরায় জবি ক্যাম্পাসে ফেরেন তিনি।

“জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না; বরং দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, জেল-জুলুম, নির্যাতন ও অজস্র মানুষের আত্মত্যাগের ধারাবাহিক পরিণতি। শহীদদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে যেন আর কখনো দুঃশাসন ও ভোটাধিকার হরণের পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সেটিই আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার, ” রুমি, যুগ্ম আহ্বায়ক, জবি ছাত্রদল

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে আসা এই ছাত্রনেতার কাছে ‘জুলাই’ কেবল একটি মাসের নাম নয়, বরং এটি একটি পুরো প্রজন্মের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক অবিনশ্বর প্রতীক।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১