
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান হয়েছে। এখন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক সংকটও অনেকটা কমে এসেছে বলে জানিয়েছে সরকার। নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে বিদ্যালয়ে যোগ দেবেন।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে একজন শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মোমিন একাই ৭০ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পাশাপাশি সামলাচ্ছেন প্রশাসনিক দায়িত্ব। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
আবদুল মোমিন বলেন, ‘শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান। বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারক, শিক্ষকদের কাজের সমন্বয়, বিভিন্ন নথি সংরক্ষণ, আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তাঁকে পালন করতে হয়।
ফলে কোনো বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে একজন সহকারী শিক্ষককে এসব দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসও নিতে হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য শিক্ষকসংখ্যা কার্যত আরও কমে যায়।
কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়ের ২২৫ শিক্ষার্থীকে পাঠদানের পাশাপাশি তাঁকে প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ এবং সরকারি বিভিন্ন দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে।
মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘একসঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
বিধি অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে এবং ৮০ শতাংশ পদ সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। ২০১৩ সালের নিয়োগ বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত একটি বিধান চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। গত ২ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের একটি রায় বাতিল করে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধানের বিষয়ে দীর্ঘদিনের বড় একটি বাধা দূর করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ ব্যবস্থায় সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণে শিগগির সরকারি কর্ম কমিশনে আনুষ্ঠানিক চাহিদাপত্র পাঠানো হবে।
গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছিলেন, সারা দেশে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সোনারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় তিনটি ক্লাস বাতিল করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষককে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয়। কখনো বাংলা, ধর্ম ও ইংরেজি—তিনটি বিষয়ও একই শিক্ষককে পড়াতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘সহকারী শিক্ষক সংকট এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আরও প্রায় দুই হাজার শিক্ষক প্রয়োজন। নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার শিক্ষক বর্তমানে পুলিশি যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এরপর তাদের দুই মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। মূলত এসব শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই মাস পিছিয়ে আছেন।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘বার্ষিক খাতভিত্তিক কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন ২০২৪’-এর তথ্য বলছে, দেশের ১২ হাজার ৯৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন চারজন বা তারও কম। এর মধ্যে ১৩৩টি বিদ্যালয়ে মাত্র একজন এবং ৬৩৩টি বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন শিক্ষক রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম শিক্ষকস্বল্পতায় থাকা কিছু বিদ্যালয় এখনো ন্যূনতম মানবসম্পদ দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান এবং একাধিক শ্রেণিকে একসঙ্গে পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে ৬ দশমিক ২৯ জন শিক্ষক ছিলেন। বিদ্যালয়প্রতি গড় শিক্ষকসংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে চট্টগ্রাম—৬ দশমিক ৬৫ জন। এরপর ঢাকা ৬ দশমিক ৫২ এবং রাজশাহী ৬ দশমিক ৪৬ জন। অন্যদিকে সিলেটে বিদ্যালয়প্রতি গড় শিক্ষকসংখ্যা ৫ দশমিক ৫৯ এবং বরিশালে ৫ দশমিক ৮৯ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়প্রতি শিক্ষকসংখ্যার এই পার্থক্য আঞ্চলিক বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়, যা শিক্ষা প্রদানের ধারাবাহিকতা ও মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার ২৪ নম্বর পূর্ব আলিয়াবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন তিনজন। বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সিহাব মোল্লা জানায়, শিক্ষক সংকট সরাসরি তাদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলছে। একজন শিক্ষককে প্রায়ই একই সময়ে দুটি ক্লাস নিতে হয়। আবার কখনো একটি ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে অন্য শ্রেণিতে যেতে হয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, অপর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সীমিত যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি—সব মিলিয়ে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির ৬১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলা বিষয়ে তৃতীয় শ্রেণির ৫১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘শিক্ষক সংকট বহু বছর ধরেই রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির পর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কেন দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। শিক্ষক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুর্বল শিক্ষার্থীরা। কারণ তাদের বাড়তি সহায়তা বা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করার সুযোগ কমে যায়।’
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা, যোগ্য শিক্ষক খুঁজে পেতে সমস্যা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় কাজ করতে কিছু শিক্ষকের অনাগ্রহ—সব মিলিয়েই সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক বছর ধরে শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।’
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :