কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিক্ষার সহায়ক, নাকি শেখার বিকল্প?


আবিদা আফরিন রিচি প্রকাশের সময় : ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪৮ অপরাহ্ণ ৭১
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিক্ষার সহায়ক, নাকি শেখার বিকল্প?

“একটি অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দাও”—মাত্র পাঁচটি শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পর্দায় হাজির হয়ে যায় প্রায় নিখুঁত একটি লেখা। কোনো লাইব্রেরি নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা নয়, এমনকি অনেক সময় নিজের মাথা খাটানোরও প্রয়োজন পড়ে না। প্রযুক্তির এই গতি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি প্রশ্ন নীরবে সামনে এসে দাঁড়ায়—অ্যাসাইনমেন্টটি শেষ হলো, নাকি শেখার প্রক্রিয়াটাই শেষ হয়ে গেল?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একই সঙ্গে সম্ভাবনারও নাম, আবার সতর্কতারও। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিদিনই আমি এর উপস্থিতি অনুভব করি। জটিল কোনো তত্ত্ব সহজভাবে বোঝা, বিদেশি ভাষার গবেষণাপত্র অনুবাদ করা, উপস্থাপনার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা কিংবা নিজের লেখাকে আরও পরিমার্জিত করা—এসব ক্ষেত্রে এআই নিঃসন্দেহে একটি কার্যকর সহায়ক। এমন অনেক বিষয় আছে, যা বুঝতে আগে দীর্ঘ সময় লেগে যেত, এখন কয়েক মিনিটেই পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে শেখার সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়েছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়, সেখানে এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও এখন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা, গবেষণা কিংবা ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে। ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও অনেকটাই কমেছে। প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এটি শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য করে তুলতে পারে।

কিন্তু প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তিই কখনো কখনো তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়। কারণ আমরা যখন কোনো উত্তর খুব সহজে পেয়ে যাই, তখন উত্তরটি কীভাবে তৈরি হলো, সেই প্রশ্নটি আর করি না। আমরা ফলাফলটি গ্রহণ করি, কিন্তু চিন্তার পথটি এড়িয়ে যাই। অথচ শিক্ষা কখনোই শুধু উত্তর মুখস্থ করার নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভুল করতে শেখায়, ভুল থেকে শিখতে শেখায় এবং নিজের যুক্তি তৈরি করার সাহস দেয়। এই প্রক্রিয়াটিই একজন শিক্ষার্থীকে সত্যিকারের শিক্ষিত করে তোলে।

আজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কোনো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার আগে অনেকেই প্রথমে এআইয়ের কাছে যায়। কেউ বিষয়টি বোঝার জন্য, আবার কেউ পুরো লেখাটি তৈরি করে নেওয়ার জন্য। এই দুই ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এআই একজন শিক্ষকের মতো আমাদের শেখায়, তাহলে সেটি আশীর্বাদ। কিন্তু যদি সেটিই আমাদের হয়ে ভাবতে শুরু করে, তাহলে ধীরে ধীরে আমাদের নিজের চিন্তার ক্ষমতাই দুর্বল হয়ে পড়বে।

আরও একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার—এআই সব সময় সঠিক নয়। অনেক সময় এটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন তথ্যও উপস্থাপন করে, যার বাস্তব ভিত্তি নেই কিংবা যা অসম্পূর্ণ। তাই এআই থেকে পাওয়া প্রতিটি তথ্য যাচাই করার অভ্যাস একজন দায়িত্বশীল শিক্ষার্থীর জন্য অপরিহার্য। কারণ প্রযুক্তি ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যাচাই করার দায়িত্ব এখনো মানুষেরই।
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে এআই ব্যবহারের জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। কোথাও এর ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে, কোথাও আবার শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে

দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহার করতে হয়। আমার মনে হয়, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধান নয়। কারণ যে প্রযুক্তি ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র, গবেষণা ও সমাজের অংশ হয়ে উঠছে, তাকে অস্বীকার করে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। বরং আমাদের শেখাতে হবে—কখন এআই ব্যবহার করা উচিত, কেন ব্যবহার করা উচিত এবং কোথায় নিজের চিন্তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একটি সময় ছিল, যখন ক্যালকুলেটর নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক ছিল। অনেকে মনে করেছিলেন, এটি শিক্ষার্থীদের গণিত শেখার আগ্রহ নষ্ট করবে। পরে দেখা গেল, ক্যালকুলেটর গণিত শেখার বিকল্প নয়; বরং একটি সহায়ক মাধ্যম। হয়তো এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য হবে। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার প্রযুক্তি শুধু হিসাব করছে না, ভাষা লিখছে, ধারণা দিচ্ছে, এমনকি যুক্তিও সাজিয়ে দিচ্ছে। তাই এর ব্যবহার আরও বেশি সচেতনতা দাবি করে।

একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় পরিচয় সে কত দ্রুত উত্তর লিখতে পারে, তা নয়; বরং সে কত গভীরভাবে একটি প্রশ্নকে বুঝতে পারে। কৌতূহল, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির কোনো শর্টকাট নেই। তাই আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি শেখাকে সহজ করবে, কিন্তু শেখার বিকল্প হয়ে উঠবে না। কারণ একটি ভালো উত্তর পাওয়ার চেয়ে, সেই উত্তর পর্যন্ত পৌঁছানোর চিন্তার পথটি অনেক বেশি মূল্যবান।

লেখক : আবিদা আফরিন রিচি,
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইন্টার্ন, অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাব (এডিএল)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১