
সম্প্রতি ভারতের নয়ডার একটি বহুতল আবাসিক ভবনের একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা বিষয়টি নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ায় পুরো আবাসিক এলাকায় টানা প্রায় তিন দিন বিদ্যুৎ ছিল না।
বন্ধ হয়ে যায় লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), ওয়াই-ফাই, পানির পরিশোধন যন্ত্র, এমনকি মোবাইল চার্জ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। মোমবাতির আলোয় রান্না, গরমে নির্ঘুম রাত আর ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে আধুনিক জীবনের প্রায় সব সুবিধাই যেন এক মুহূর্তে হারিয়ে যায়।(ইন্ডিয়া টুডে)
তবে এই তিন দিনের অন্ধকার শুধু দুর্ভোগের গল্প নয়। বিদ্যুৎ না থাকায় শিশুরা মোবাইল ছেড়ে মাঠে নেমে খেলেছে, প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ নিয়েছেন, সবাই মিলে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
ব্যস্ত শহুরে জীবনে হারিয়ে যাওয়া আড্ডা ও মানবিক সম্পর্ক যেন আবারও ফিরে এসেছে। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর পরিবারটি বলেছে, এই অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে—একটি চলমান ফ্যান, ঠাণ্ডা পানির বোতল, চার্জ দেওয়া মোবাইল কিংবা সচল ইন্টারনেটের মতো সাধারণ সুবিধাগুলোর মূল্য আমরা অনেক সময় উপলব্ধিই করি না। কয়েক দিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের সঙ্গ, প্রতিবেশীর সহযোগিতা এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও খুব আলাদা নয়। তাই লোডশেডিংয়ের সময় শুধু বিরক্ত না হয়ে, চাইলে এই সময়টুকু নিজের, পরিবারের এবং আশপাশের মানুষের জন্য অর্থবহ করে তোলা যেতে পারে।
লোডশেডিংয়ের সময় যেভাবে কাজে লাগাতে পারেন সময়টাকে
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান
ব্যস্ত জীবনে একই ছাদের নিচে থাকলেও অনেক পরিবারের সদস্যের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলার সুযোগ হয় না। বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল বা টেলিভিশন সরিয়ে রেখে পরিবারের সঙ্গে গল্প করুন, একসঙ্গে চা পান করুন কিংবা লুডু, ক্যারম বা তাস খেলুন। ছোট ছোট এই মুহূর্তগুলো সম্পর্ককে আরো গভীর করে।
শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন
লোডশেডিং শিশুদের জন্য নতুন কিছু শেখার সুযোগও হতে পারে। মোবাইল বা ট্যাবের বদলে তাদের বই পড়তে, ছবি আঁকতে, ধাঁধা মেলাতে কিংবা ছাদ বা উঠানে খেলতে উৎসাহ দিন। এতে তাদের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
বিদ্যুৎ না থাকলে অনেকেই ঘরের বাইরে বের হন। এই সুযোগে প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচিত হোন, খোঁজখবর নিন বা কিছু সময় গল্প করুন। জরুরি পরিস্থিতিতে একটি ভালো প্রতিবেশীই সবচেয়ে বড় ভরসা হতে পারেন।
ডিজিটাল ডিটক্স করুন
দিনের বড় একটি সময় আমরা মোবাইলের পর্দায় কাটাই। লোডশেডিংয়ের কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থেকে নিজের জন্য সময় বের করতে পারেন। ডায়েরি লিখুন, ধ্যান করুন বা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গুছিয়ে নিন। এতে মনও কিছুটা স্বস্তি পাবে।
বই পড়ুন বা নতুন কিছু শিখুন
দিনের আলো থাকলে প্রিয় কোনো বই পড়তে পারেন। পরিবারের ছোটদের গল্প শোনাতে পারেন বা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার পরিকল্পনা করতে পারেন। সব সময় বিনোদনের জন্য স্ক্রিনের প্রয়োজন হয় না।
জরুরি প্রস্তুতি রাখুন
লোডশেডিং দীর্ঘ হলে ভোগান্তিও বাড়ে। তাই বাসায় চার্জলাইট, পাওয়ার ব্যাংক, মোমবাতি, দেশলাই, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ আগে থেকেই রাখুন। বিদ্যুৎ থাকলে মোবাইল, ল্যাপটপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস চার্জ দিয়ে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
গরমে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্ব দিন
বিদ্যুৎ না থাকলে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করুন, হালকা ও সুতি পোশাক পরুন এবং শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বাড়তি যত্ন নিন। প্রয়োজনে ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখতে পারেন।
ছোট ছোট সুবিধার মূল্য উপলব্ধি করুন
একটি চলমান ফ্যান, ঠান্ডা পানির বোতল, সচল ইন্টারনেট বা চার্জ দেওয়া মোবাইল—এসবকে আমরা প্রতিদিন খুব সাধারণ বিষয় বলে ধরে নিই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটই বুঝিয়ে দেয়, এই ছোট ছোট সুবিধাগুলো আমাদের জীবনকে কতটা সহজ করে তোলে।
অন্ধকারেও থাকতে পারে আলোর দিশা
লোডশেডিং অবশ্যই দুর্ভোগের, এবং এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে নয়ডার সেই পরিবারের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অন্ধকারের মধ্যেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে নতুন উপলব্ধি। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময়, প্রতিবেশীর সঙ্গে একটু গল্প, শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে এনে প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা নিজের জন্য কয়েকটি নিরিবিলি মুহূর্ত—এসবই হতে পারে লোডশেডিংয়ের অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি।
হয়তো বিদ্যুৎ চলে যাওয়া আমাদের হাতে নেই। কিন্তু সেই সময়টুকু কীভাবে কাটাব, সেটি আমাদেরই সিদ্ধান্ত। কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির বাইরেও জীবন আছে, আর সেই জীবনও হতে পারে সুন্দর, আন্তরিক ও অর্থবহ।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :