
তবে এসব অভিযোগের কোনটি সত্য, কোনটি ভুল এবং কোনটির পেছনে নথিভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, তা নির্ধারণে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, প্রকল্পের অর্থছাড় ও ব্যয়ের হিসাব, অডিট প্রতিবেদন, দরপত্রের কাগজপত্র এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা ছাড়া কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
প্রফেসর ড. মো. আতিয়ার রহমান ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি রাবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর দায়িত্বকালে দুই দফায় ২৯ জন শিক্ষক ও আটজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এসব নিয়োগের একটি অংশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশ পার্বত্য অঞ্চলের বাইরের প্রার্থী। তবে কোনো নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—তা নির্ধারণের মূল বিষয় হওয়া উচিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত, প্রার্থীদের যোগ্যতা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, কোরাম, অনুমোদিত জনবল কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।
নিয়োগ-সংক্রান্ত এসব নথি পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
নিয়োগের পর কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের কেউ রেজিস্ট্রার, ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, প্রক্টর ও বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মতো পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রাপ্তদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
‘২৪ ও ৭১’ নিয়ে স্মৃতিফলক বিতর্ক
সাবেক উপাচার্যের দায়িত্বকালীন একটি সমন্বিত স্মৃতিফলক নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ২০২৪ সালের ঘটনাবলিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মুক্তিযুদ্ধের ১৯৭১ সালের ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্মৃতিফলকের নকশা, অনুমোদন, ব্যবহৃত বক্তব্য ও নির্মাণব্যয়ের নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
‘ঝগড়া বিল’ নাম পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি ‘ঝগড়া বিল’ মৌজার নাম পরিবর্তন নিয়ে সাবেক উপাচার্যের মন্তব্যের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ও ঐতিহাসিক কোনো স্থানের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
উন্নয়নকাজ ও ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ ও প্রশাসনিক ভবন-২-এর ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন এবং ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজে যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য জানতে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, ই-জিপি নথি, কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন ও অর্থ পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ করার জন্য ২০ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছিল। কমিটি বিভিন্ন পক্ষকে ডেকে ছোট ছোট কাজ করিয়েছে। তিনি এ কাজকে কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে দরপত্রের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় ও ব্যয়ের হিসাব কোথায়?
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় এবং গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অর্থ নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক উপাচার্যের দায়িত্বকাল শেষে সংশ্লিষ্ট হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট ছিল না।
তবে এ দাবির সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আয়-ব্যয়ের হিসাব, ভাউচার, অডিট রিপোর্ট ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা জরুরি। এতে কত টাকা জমা ছিল, কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে এবং প্রতিটি ব্যয় বিধি মেনে হয়েছে কি না—তা জানা সম্ভব হবে।
১০ শিক্ষার্থী বহিষ্কার নিয়েও প্রশ্ন
২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাবিপ্রবির ১০ শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং ছাত্রত্ব ও সনদপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আন্দোলনকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, র্যাগিংসহ বিভিন্ন অভিযোগের পর তদন্তের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তের আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে সাবেক উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের বক্তব্য, বহিষ্কার রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্তে হয়েছে। তাঁর দাবি, এর আগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, রিজেন্ট বোর্ডের কার্যবিবরণী এবং শিক্ষার্থীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব নথি পর্যালোচনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ি, বিমান ও ভ্রমণ ব্যয়ের হিসাব
সাবেক উপাচার্যের সরকারি গাড়ি ব্যবহার ও বিমানযোগে যাতায়াতের ব্যয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো সময়ে গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারীকে গাড়ি নিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে তিনি নিজে বিমানে যাতায়াত করেছেন।
এ অভিযোগ যাচাই করতে গাড়ির লগবুক, জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব, চালকের দায়িত্বপত্র, ভ্রমণ বিল, বিমান টিকিট ও সফরসূচি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। নথি যাচাই ছাড়া এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রশাসনে বিভাজনের অভিযোগ
কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পুরোনো ও নতুন শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন তৈরির অভিযোগও উঠেছে সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অফিস আদেশ, সভার কার্যবিবরণী, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্প: অনুমোদন কত, ব্যয় কত?
রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থ ব্যয় নিয়ে। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১১৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে ১৪৫ কোটি ৫৮ লাখ এবং দ্বিতীয় সংশোধনীতে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা হয় বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, দীর্ঘ সময়ে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ফলে ‘১৬৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ’—এমন কোনো অভিযোগ থাকলে প্রথমেই স্পষ্ট করতে হবে, ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ছিল প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয়, নাকি প্রকৃতপক্ষে সরকারের কাছ থেকে ওই পুরো অর্থ ছাড় হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বিভিন্ন কাজে ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিমূল্যে ক্রয়, অগ্রিম অর্থ উত্তোলনসহ অনিয়মের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয়, সরকারের অর্থছাড়, প্রকৃত ব্যয় এবং প্রতিটি ব্যয়ের বিপরীতে কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, প্রকৌশলীর প্রত্যয়ন ও ব্যাংক লেনদেন—সবকিছু আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আতিয়ার রহমান কতটা সম্পৃক্ত?
প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সাবেক উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততা কতটা ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোন নথিতে তিনি অনুমোদন দিয়েছেন, কোন প্রকল্প কমিটির সভায় অংশ নিয়েছেন এবং কোন ব্যয়ের বিষয়ে তাঁর প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল—এসব তথ্য নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে, প্রকল্পের সাবেক পরিচালক আবদুল গফুরকে ঘিরেও ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তাই উপাচার্যের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকল্প পরিচালকের আর্থিক ও বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব—দুটি বিষয় আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন
রাবিপ্রবির অবকাঠামো উন্নয়নে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পের আওতায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন, আবাসিক হলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে।
প্রকল্পের কাজ কোথায় কতটা এগিয়েছে, কোন কাজ শেষ হয়েছে, কোনটি অসম্পূর্ণ এবং কোথায় বিলম্ব হয়েছে—এসব বিষয়ও প্রকল্পের নথি ও মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রয়োজন নথিভিত্তিক তদন্ত
রাবিপ্রবির সাবেক উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের আমল নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা হিসেবে দেখার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি তদন্ত ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না।
নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ বিধি ও বোর্ডের কার্যবিবরণী, প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থছাড় ও ব্যয়ের হিসাব, আর্থিক বিষয়ে অডিট নথি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অফিস আদেশ ও সভার কার্যবিবরণী—এসব নথি পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
সাবেক উপাচার্যের দায়িত্বকালে নিয়োগ, পদায়ন, উন্নয়নকাজ, আর্থিক ব্যয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায় নির্ধারণের সুযোগ থাকবে; আবার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে সেটিও স্পষ্ট হবে।
এ বিষয়ে সাবেক উপাচার্য ড. আতিয়ার রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগটি কী, তা তিনি জানেন না; তাই এ বিষয়ে কী বক্তব্য দেবেন।
তবে ১০ শিক্ষার্থী বহিষ্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং এর আগে তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে তিনি ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজের বিষয়ে ২০ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানান এবং বলেন, কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষকে দিয়ে ছোট ছোট কাজ করানো হয়েছে।
পরবর্তী পর্বে নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম, প্রকল্পের অর্থছাড় ও ব্যয়ের নথি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :