চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বদলে গেছে বন্দিজীবনের অভ্যন্তরের চিত্র


শিমুল রেজা, চুয়াডাঙ্গা প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫১ অপরাহ্ণ ৫০
চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বদলে গেছে বন্দিজীবনের অভ্যন্তরের চিত্র

কারাগার মানেই শুধু শাস্তি, দুঃখ-কষ্ট আর বন্দিত্ব—দিন দিন বদলে যাচ্ছে সেই প্রচলিত ধারণা। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং সংশোধন ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা কারাগারকে ধীরে ধীরে একটি সংশোধনাগারে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে এ কারাগারে হাজতি, কয়েদি ও দর্শনার্থীদের আগের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। বন্দিদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসক, দায়রা জজসহ সরকারি ও বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের কারণে কারা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

৯ একর জায়গায় কারাগারের অবকাঠামো

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গা কারাগারে বর্তমানে ৭৯০ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী বন্দি রয়েছেন। কারাগারে একতলা ও দোতলা বিশিষ্ট বিভিন্ন ভবন রয়েছে।

কারাগারটিতে রয়েছে আটটি বন্দি ভবন, ২০ শয্যার একটি কারা হাসপাতাল, একটি কিশোর ওয়ার্ড, একটি লাইব্রেরি, ২৪টি সেল ও একটি ক্যান্টিন। হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া জেলা সুপারের জন্য আবাসিক ভবন এবং পুরুষ ও নারী কারারক্ষীদের জন্য পৃথক ব্যারাক রয়েছে।

বর্তমানে জেলারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৯০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কারাগারে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ৮০ জন পুরুষ এবং ১০ জন নারী কারারক্ষী রয়েছেন।

মাদক ও অবৈধ দ্রব্য ঠেকাতে কঠোর নজরদারি

কারাগারের অভ্যন্তরে মাদক ও অবৈধ দ্রব্যের প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলার মো. শাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২০ দিনে কারাভ্যন্তরকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ দ্রব্যের প্রবেশ রোধে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সন্দেহভাজন বন্দি ও স্টাফদেরও বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।

কারাগার ক্যাম্পাসকে মোবাইল ফোনমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিনামূল্যে সাক্ষাৎ ও আইনি সহায়তা

বন্দিদের স্বজনদের জন্য বিনামূল্যে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান জেলার। হতদরিদ্র কোনো বন্দির আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

কারাগারে বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিনোদন ও শরীরচর্চার সুযোগ

কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বন্দিদের চিত্তবিনোদনের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে এ সুযোগ সীমিত ছিল, বর্তমানে প্রতিটি ওয়ার্ডে টেলিভিশন দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্দিদের জন্য ক্যারাম খেলার সুযোগ রাখা হয়েছে।

শারীরিকভাবে সুস্থ রাখতে ব্যায়াম ও শরীরচর্চার ব্যবস্থাও রয়েছে। কারাগারের পরিবেশ আরও সুন্দর করতে বিভিন্ন স্থানে ফুলের বাগান করা হয়েছে। বন্দিরা অবসর সময়ে বসে সময় কাটাতে পারেন—এ জন্য পাকা পাঠাতনের ওপর বেঞ্চও স্থাপন করা হয়েছে।

‘কারাগার থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক বন্দিরা’

সম্প্রতি তিন বছর কারাভোগের পর চুয়াডাঙ্গা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি কারাগারের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, গত কয়েক মাসে কারাগারের খাবারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কারণে বর্তমানে কারাগারের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ কমেছে বলেও তিনি মনে করেন।

কারা কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য হলো, বন্দিরা সাজা শেষে যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। এ জন্য নিরক্ষরতা দূরীকরণ, ধর্মীয় শিক্ষা এবং নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুযোগসহ বিভিন্ন সংশোধনমূলক কার্যক্রম চালু রয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু শাস্তি প্রদান নয়, বন্দিদের মানসিক ও সামাজিকভাবে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করাই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য। সংশোধন ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্দিদের অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে সাজা শেষে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন

Google-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

Google-এ পড়ুন লাখোকণ্ঠের খবর 

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০