
৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের আদালতে ছয়জনকে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনা ও একজন তাইওয়ানের নাগরিক। অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, কয়েক ডজন কম্পিউটার, মনিটরসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন, যাদের অধিকাংশই চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক, পালিয়ে গেছে।
হোটেলের ভেতরেই ছিল বিশাল প্রযুক্তি অবকাঠামো
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকার একটি রিসোর্টের হলরুমকে কম্পিউটার পরিচালনার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল। সেখানে ছয়টি শব্দনিরোধক কক্ষ, বিপুলসংখ্যক আইফোন, মনিটর, সিপিইউ, কিবোর্ড, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইস পাওয়া যায়।
প্রাথমিকভাবে অনলাইন জুয়ার সন্দেহ করা হলেও পরে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট বিনিয়োগ প্রতারণার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। ভুয়া বাজার বিশ্লেষণ, প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্রস্তাব, নকল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এবং গ্রাহকের অর্থ নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার মতো কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তবে জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
তদন্তকারীদের ধারণা, এটি এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘পিগ-বাচারিং’ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে মিল থাকতে পারে। এ ধরনের প্রতারণায় প্রথমে ভুক্তভোগীর সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা হয়। পরে তাকে ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়।
কেন কক্সবাজার?
কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট ও ভাড়া বাসা রয়েছে। সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনাও থাকে। ফলে স্বল্প সময়ের জন্য কোনো সংগঠিত অপরাধী চক্রের আস্তানা গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তদন্তে কক্সবাজারের একাধিক স্থাপনায় বিদেশি নাগরিকদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, এসব স্থাপনার কিছু অংশে চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা কয়েক মাস ধরে অবস্থান করছিলেন। তবে তাদের সবাই প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও ভাড়া নেওয়া সম্পত্তি পর্যবেক্ষণের ঘাটতি। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিদেশি অতিথিদের প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে জমা দিয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা দিচ্ছে
কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে অনলাইন প্রতারণা এখন বড় ধরনের আন্তঃদেশীয় অপরাধে পরিণত হয়েছে। এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে মানব পাচার, অর্থপাচার, ভুয়া বিনিয়োগ, রোমান্স স্ক্যাম ও পরিচয় জালিয়াতির মতো অপরাধও যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় এসব চক্রের একটি অংশ এখন নতুন জায়গা খুঁজছে। শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়াতেও বিদেশি নাগরিকদের জড়িত সাইবার অপরাধের ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বড় ও সুরক্ষিত কম্পাউন্ডের পরিবর্তে ছোট হোটেল, ভিলা বা অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবহার করে চক্রগুলো ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে।
ঢাকাতেও মিলছে উদ্বেগের ইঙ্গিত
কক্সবাজারের ঘটনার আগে ঢাকার উত্তরা, বসুন্ধরা ও নিকুঞ্জ এলাকায় চীনা-সংশ্লিষ্ট কিছু অপরাধী নেটওয়ার্কের তৎপরতার খবর সামনে আসে। এসব ঘটনায় অনলাইন প্রতারণার পাশাপাশি অবৈধ ভিওআইপি ও জুয়ার অভিযোগও তদন্ত করা হয়েছে।
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কক্সবাজারের নেটওয়ার্কের সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনাকে একটি বড় আন্তর্জাতিক চক্রের অংশ হিসেবে দেখার আগে তদন্ত শেষ হওয়া জরুরি।
এখনই ‘স্ক্যাম রাজধানী’ বলা ঠিক নয়
বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশকে এখনই এশিয়ার নতুন ‘স্ক্যাম ক্যাপিটাল’ বলা যথার্থ হবে না। কম্বোডিয়া বা মিয়ানমারের মতো বড় অপরাধী অবকাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
তবে ঝুঁকিটা অন্য জায়গায়। ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন প্রতারণা চক্র যদি স্থানীয় সহযোগী, ভাড়া করা স্থাপনা, আর্থিক লেনদেনের পথ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও মানবসম্পদের একটি স্থায়ী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে কক্সবাজারের অভিযানকে শুধু ছয়জন বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তারের ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারা তাদের থাকা, যাতায়াত, সরঞ্জাম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য সুযোগটি হলো, পরিস্থিতি এখনো বড় আকার ধারণ করেনি। শুরুতেই বিদেশি নাগরিকদের নজরদারি, ভাড়া করা স্থাপনার যাচাই, সাইবার অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা গেলে বড় ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার আগেই তা ঠেকানো সম্ভব।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :