
বাইরের চোখে এসসিওকে বড় একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়। সংগঠনটির সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তবে ২৫ বছর পরও এসসিও সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসার কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে উঠতে পারেনি। বরং শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও নিজস্ব কূটনৈতিক স্বার্থই বড় হয়ে ওঠে।
একই মঞ্চে ভারত-পাকিস্তান
বিশকেক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একই মঞ্চে ছিলেন। সেখানে মোদি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ পরিহারের আহ্বান জানান। সন্ত্রাসে অর্থায়ন, নিয়োগ, উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধকরণ ও নিরাপদ আশ্রয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
মোদি পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট ছিল বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর জোর দেন। এই অবস্থানকে ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এবং ভারত-পাকিস্তান ভূখণ্ডগত বিরোধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদি। সেখানে তিনি যুদ্ধ মানবতার অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয় বলে মন্তব্য করেন এবং যুদ্ধের অবসানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ফলে এসসিওর মঞ্চে থেকেও ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান যে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়, তা আবারও স্পষ্ট হয়।
পুতিনের ব্যস্ত কূটনীতি
বিশকেক সম্মেলন রাশিয়ার জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ। পুতিন সম্মেলনের সময় মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।
এসসিওর মতো প্ল্যাটফর্ম রাশিয়াকে পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দিচ্ছে। তবে এসব বৈঠকের বড় অংশই দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও আলাদা কূটনৈতিক হিসাবকে ঘিরে পরিচালিত হয়েছে।
শির দৃষ্টিতে এসসিওর গুরুত্ব কতটা?
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও বিশকেক সম্মেলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে তাঁর কূটনৈতিক কর্মসূচি দেখিয়েছে, এসসিও বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই চীনের একমাত্র কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়।
সম্মেলনের বাইরে শি রাশিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে মিসর সফরে যান। অর্থাৎ এসসিওর বহুপক্ষীয় কাঠামোর পাশাপাশি চীন তার নিজস্ব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে।
তাহলে কতটা ঐক্যবদ্ধ এসসিও?
এসসিওকে ব্যর্থ সংগঠন বলা যাবে না। নিরাপত্তা, পরিবহন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জ্বালানি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করেছে সংগঠনটি। এবারের সম্মেলনেও ২৮টি নথি অনুমোদন হয়েছে।
তবে এর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান দেখিয়ে দেয়—একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কণ্ঠ তৈরি করা এখনও কঠিন।
বিশকেক সম্মেলনের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত এখানেই। চীন, ভারত ও রাশিয়া একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার কথা বলছে, আবার নিজেদের জাতীয় স্বার্থে পৃথক কূটনৈতিক পথও অনুসরণ করছে। ফলে এসসিওকে একক ভূরাজনৈতিক জোটের চেয়ে বিভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও দর-কষাকষির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত।
২৫ বছর পর প্রশ্নটি তাই থেকেই যাচ্ছে—এসসিও কি সত্যিই এক কণ্ঠে কথা বলা একটি শক্তি, নাকি ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর জন্য একই ছাদের নিচে নিজেদের কৌশল বাস্তবায়নের একটি কূটনৈতিক মঞ্চ?
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :