
‘ইনকাম অ্যান্ড প্রোডাক্টিভিটি অব স্মল-স্কেল ফুড প্রোডিউসার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক জরিপটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। দেশের আট বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি কৃষি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে বিবিএসের টেকসই কৃষি পরিসংখ্যান প্রকল্প। মঙ্গলবার জরিপটি প্রকাশ করা হয়।
জরিপে জমির পরিমাণ, গবাদিপশুর সংখ্যা ও কৃষি থেকে বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে কৃষকদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। এ তিনটি সূচকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিচের ৪০ শতাংশের মধ্যে থাকা কৃষকদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, একজন ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। তাঁদের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন থেকে গড় আয় ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। বিপরীতে ধান, সবজি ও অন্যান্য অস্থায়ী ফসল থেকে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা।
এ ছাড়া ফলদ ও স্থায়ী ফসল থেকে ক্ষুদ্র কৃষকের গড় আয় ২ হাজার ৩৩১ টাকা, বনজ সম্পদ থেকে ১০ হাজার ৮৯২ টাকা এবং মাছ চাষ থেকে ১২ হাজার ৬৭০ টাকা।
বিভাগভেদে আয়ে পার্থক্য
বিভাগভেদে ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক গড় আয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। রাজশাহী বিভাগে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের গড় বার্ষিক আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ; সেখানে গড় আয় ৪৪ হাজার ২৮ টাকা।
সবচেয়ে কম আয় সিলেট বিভাগে। সেখানে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক গড় আয় ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। তবে এই আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণ জরিপে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
উন্নত জাতের পশুতে বেশি আয়
জরিপে কৃষকের আয়ে গবাদিপশুর জাতের প্রভাবও উঠে এসেছে। একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু থেকে বছরে গড় আয় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৪৩ টাকা। জার্সি বা ব্রাহমা জাতের গরু থেকে গড় আয় ২ লাখ ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে দেশি গরু থেকে গড় আয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৮ টাকা।
ছাগলের ক্ষেত্রে দেশি জাত থেকে বছরে গড় আয় মাত্র ৪ হাজার ৯০২ টাকা।
মুরগির ক্ষেত্রেও জাতভেদে আয়ের পার্থক্য রয়েছে। সোনালি জাতের মুরগি থেকে বছরে গড় আয় ৩৬ হাজার ৬৩৩ টাকা, যেখানে ব্রয়লার মুরগি থেকে আয় ২৫ হাজার ৮৫৯ টাকা।
জরিপের এসব তথ্য থেকে উন্নত জাতের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে ক্ষুদ্র কৃষকদের পুঁজি ও সহজ ঋণসুবিধার সুযোগ কতটা রয়েছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকের আয় কম, উদ্বেগ খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাবেক মহাপরিচালক মো. শহজাহান কবীর বলেন, কৃষকের আয় এখনো খুবই কম। এ কারণে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক ধীরে ধীরে কৃষিকাজ থেকে সরে যাচ্ছেন, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তাঁর মতে, ক্ষুদ্র কৃষকের জায়গা ধীরে ধীরে বড় বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা দখল করছেন। তাঁদের কাছে কৃষি মূলত জীবিকার পরিবর্তে ব্যবসার একটি মাধ্যম। ফলে কৃষিতে ক্ষুদ্র কৃষকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কৃষকের কম আয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বাজারব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কথাও উঠে এসেছে। উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হওয়ায় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
নারীর শ্রমের স্বীকৃতি সীমিত
জরিপে গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগির পরিচর্যা ও দুধ দোহনের মতো কাজে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে এসব কাজে নারীর শ্রমের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো সীমিত।
জরিপ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী।
সব মিলিয়ে বিবিএসের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। তবে কৃষকের আয় বাড়াতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজ ঋণসুবিধা এবং উন্নত জাতের পশু পালনে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন
আপনার মতামত লিখুন :