আমি জিয়া বলছি…


নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা প্রকাশের সময় : ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ ৪০
আমি জিয়া বলছি…

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পরপর অভ্যুত্থান, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ওইদিন ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছিলেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।

সেনাসদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মিছিল, স্লোগান ও উচ্ছ্বাসে বদলে যায় রাজধানীর পরিবেশ। এ ঘটনা ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ নামে পরিচিত হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ও প্রকৃত চরিত্র নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা।

কেউ দিনটিকে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখেন। কারও মতে, এটি ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে সংঘটিত আরেকটি সামরিক ক্ষমতার পালাবদল। আবার ইতিহাসের আরেকটি ব্যাখ্যায় এ ঘটনার সঙ্গে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এর পর থেকেই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে।

৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায়। ওই সময় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসের বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়। একই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে।

পরবর্তী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার তৎপরতা চলছিল।

৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ভোরে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের একটি অংশ বিদ্রোহে অংশ নেয়। এ ঘটনায় জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা এবং আবু তাহেরের সংশ্লিষ্টতা ইতিহাসের আলোচিত বিষয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে পদমর্যাদাভিত্তিক বৈষম্য ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষও বিদ্রোহের পটভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়।

একপর্যায়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। রেডিও বাংলাদেশ থেকে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার ঘোষণা প্রচারিত হয়। এরপর বেতারে শোনা যায় তাঁর কণ্ঠ—‘আমি জিয়া বলছি’। তিনি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান।

তবে ওইদিনের ঘটনাপ্রবাহ শুধু জিয়াউর রহমানের মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অভ্যুত্থানের সময় খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও মেজর এ টি এম হায়দার নিহত হন। ফলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন ঘটে।

৮ নভেম্বরের সংবাদপত্রে কেমন ছিল ঢাকার চিত্র

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পরদিন, ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের সংবাদপত্রগুলোতে রাজধানীর পরিস্থিতি, জিয়াউর রহমানের মুক্তি, সেনাসদস্যদের অবস্থান এবং নতুন প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

দৈনিক ইত্তেফাকের ‘প্রাণবন্যার উচ্ছল নগরী’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আগের রাতের উৎকণ্ঠা এবং পরদিনের উল্লাসের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাতের গোলাগুলির শব্দ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নগরবাসী উদ্বিগ্ন ছিলেন। পরে রেডিওতে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার ঘোষণা এবং জিয়াউর রহমানের মুক্তির খবর প্রচারিত হলে ভোর থেকেই মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

সেনাবাহিনীর গাড়ি, ট্যাঙ্ক ও সামরিক যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। সৈনিকদের সঙ্গে মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময়, আলিঙ্গন ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নগরী।

ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘স্বাধীনতা, আমার স্বাধীনতা’। এতে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দৈনিক বাংলার প্রধান শিরোনাম ছিল ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লব’

৮ নভেম্বরের দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম ছিল ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লব’। পত্রিকাটি ঘটনাটিকে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বিপ্লব হিসেবে উপস্থাপন করে।

‘আনন্দে উদ্বেল মানুষের ঢল নেমেছিল’ শিরোনামের প্রতিবেদনে রায়েরবাজার, জিগাতলা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে ছাত্র-যুবক, নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের রাজপথে উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।

সেনাবাহিনীর খোলা গাড়ি, জিপ ও ট্যাঙ্কে সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও দেখা যায়। তাঁদের স্লোগানের মধ্যে ছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’।

দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। এতে সিপাহি-জনতার ঐক্যকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব এবং সশস্ত্র বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ঐক্যের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

দৈনিক সংবাদে নতুন সামরিক প্রশাসনের চিত্র

৮ নভেম্বর দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল ‘সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত’। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নেতৃত্বে নতুন সামরিক আইন প্রশাসনের কাঠামো গঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

একই সংখ্যায় ‘দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি জিয়ার অভিনন্দন’ এবং ‘রাজধানীর পথে পথে লাখো জনতার আনন্দ মিছিল’সহ বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি, ফুল দিয়ে সৈনিকদের শুভেচ্ছা জানানো এবং মিছিলের বর্ণনা পাওয়া যায়। সম্পাদকীয়তে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে ওই সময়ের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে একটি তথ্য স্পষ্ট করা জরুরি। ৭ নভেম্বরের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ফিরে আসেন এবং উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। তিনি ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সংবাদপত্রের ভাষ্য ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদপত্র ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি গুরুত্ব পায়।

ফরাসি দৈনিক লে মঁদে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্টের ৮ নভেম্বরের প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসা এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে আসে।

এ পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, একই ঘটনাকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে ব্যাখ্যা করেছিল। সে সময়ের দেশীয় সংবাদপত্রে রাজপথের উচ্ছ্বাস ও জনসম্পৃক্ততা বেশি গুরুত্ব পেলেও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সামরিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার পরিবর্তন প্রাধান্য পায়।

আবু তাহেরের ভূমিকা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতি

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের এবং জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। তাঁদের লক্ষ্য ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে ভিন্নমত রয়েছে।

অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান ও আবু তাহেরের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর আবু তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক আদালতে বিচারের পর ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই পরিণতি ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে।

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়

১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনগুলো সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। এসব প্রতিবেদনে রাজপথের মানুষের উপস্থিতি, সেনাসদস্যদের উচ্ছ্বাস, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর বিবরণ পাওয়া যায়।

তবে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয়কে সে সময়ের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক মূল্যায়নের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। এগুলো মূলত ঘটনাকালীন সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে।

সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক বিদ্রোহ, জনসম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দিনটিকে কেউ ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে স্মরণ করেন, আবার কেউ সামরিক অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে মূল্যায়ন করেন। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে হলে এসব ভিন্ন ব্যাখ্যা, সমকালীন দলিল এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

 

ই-প্রিন্ট

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০