হনুমানের অকৃত্রিম বন্ধু নাজমুল


প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:২৭ অপরাহ্ণ
হনুমানের অকৃত্রিম বন্ধু নাজমুল

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান:নাজমুলের জন্ম ১৯৮৮ সালে ভবনগর গ্রামে। তাঁর জন্মের অনেক আগে থেকেই ভবনগর কালোমুখো হনুমানগুলোর বাস। সেই সময়ে অনেক ফলদ গাছ ছিল। ফল, সবজিরও অভাব ছিল না। গাছপালা কেটে ফেলার কারণে হনুমানগুলোর জীবনে নেমে আসে খাদ্যাভাব। ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে তখন এরা মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলে হামলা শুরু করে। মানুষে হনুমানের সুন্দর সর্ম্পক বৈরী হতে থাকে। অবশ্য এ জন্য মানুষকেই দায়ী করছেন নাজমুল।

একবার একজন খাওয়ার পানির মধ্যে বিষ মিশিয়ে রেখেছিল। খেয়ে ৫০টির মতো হনুমান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। বিষয়টি নাজমুলের মনে গভীর রেখাপাত করে। স্থানীয় দৈনিকে লেখালেখি করে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন তিনি। পরে নিজের টাকায় পাকা কলা, পাউরুটি নিয়ে হনুমানদের খাওয়ান। তখন একদল মানুষ বলতে লাগল, ‘ও একটা পাগল। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে হনুমানকে খাওয়ায়।’ ফুল, কমলা, মাল্টা, আম ও কলার বাগান আছে নাজমুলের। একদল মানুষ হনুমানগুলোকে তাঁর বাগানের দিকে তাড়িয়ে দেয়।

যেন বিরক্ত হয়ে হনুমানের সেবা থেকে সরে আসে। হয়েছে উল্টো। রুটি, কলার পাশাপাশি বাদাম, সবজি, ফলমুল ইত্যাদি খাওয়াতে শুরু করেন নাজমুল। বিষয়টি বন বিভাগের নজর এড়ায়নি। ২০২১ সালে প্রথমবার বন অধিদপ্তর সপ্তাহে তিন দিন কিছু খাবার দেয় হনুমানের জন্য। পরের বছর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১১ কেজি পাকা কলা, এক কেজি বাদাম, দুই কেজি রুটি বরাদ্দ দেয় বন বিভাগ। এখন সেটা প্রায় ২৩ কেজিতে ঠেকেছে। এর মধ্যে আছে ১৬ কেজি পাকা কলা, দুই কেজি ৪০০ গ্রাম বাদাম, দুই কেজি ৪০০ গ্রাম রুটি, দুই কেজি সবজি। এর সঙ্গে দুই কেজির মতো শাক, সবজি, ফলমুল কিনে মিশিয়ে নেন নাজমুল। প্রায় ২৫ কেজি খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে নাজমুলকে পুরো গ্রাম চষে বেড়াতে হয়। কারণ দুই শতাধিক হনুমান সব সময় এক জায়গায় থাকে না।

প্রথম দিকে হনুমানগুলো ভয় পেত। এখন ওরা নাজমুলের বন্ধু হয়ে গেছে। ডাকলেই ছুটে আসে। অসুস্থ হলে সেবা নিতেও ভয় করে না। এরই মধ্যে ২২টির মতো অসুস্থ হনুমানের চিিকসা ব্যবস্থা করেছেন নাজমুল। জানালেন, হনুমানগুলো বেশির ভাগ হাত-পা ভেঙে, মাথায় আঘাত পেয়ে অসুস্থ হয়। ওদের নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন নাজমুল। সমস্যা জটিল হলে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সাহায্য নেন। নাজমুলের কাজের পরিধি শুধু হনুমান রক্ষায় থেমে নেই। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট হ্যান্ডলিং প্রশিক্ষণ বিষয়ে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। মৃত প্রাণী সংরক্ষণেও নাজমুল তৎপর। সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য টাঙ্গাইল আঞ্চলিক জাদুঘর ও ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে দুটি পাখি, এতটি রাসেল ভাইপার, একটি মহাবিপন্ন অ্যালবিনো সাপ এবং দুটি হনুমান পাঠিয়েছেন তিনি।

মহেশপুর উপজেলার খাল, বিল, মাঠ ও ঘাটে থাকা পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির সুরক্ষায় তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। নাজমুল জানান, বিভিন্ন সময় অসাধু লোকজন খাল-বিলে জাল পেতে কিংবা টোপ ব্যবহার করে পাখি শিকার করে। এমন কিছু দেখলেই তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন। কখনো জাল খুলে নষ্ট করে দেন, আবার কখনো স্থানীয়দের সতর্ক করেন এবং বন্য প্রাণী আইন সম্পর্কে সচেতন করেন। বর্ষা মৌসুমে অতীতে যেখানে পাখিরা বাসা বাঁধত, সেই সব বিলে নিয়মিত নজরদারি করেন, যেন কেউ বাসা থেকে ছানা নিয়ে যেতে না পারে।

এই এক দশকে নাজমুল শিকারিদের হাত থেকে উদ্ধার করে শতাধিক পাখি অবমুক্ত করেছেন। উদ্ধারকৃত পাখির মধ্যে রয়েছে টিয়া, ঘুঘু, ডাহুক, বক, পাতি সরালি, কাদাখোঁচা, কালিম, লক্ষ্মীপেঁচা, চিল ও ইগল। পাশাপাশি বন বিভাগের অপরাধ দমন ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে তিনি ৩০টি টিয়া ও চারটি কালিম উদ্ধারে সহযোগিতা করেছেন। অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসায়ও নাজমুলের রয়েছে অনন্য অবদান। বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকের কাছ থেকে হুমকিও পেয়েছেন, তবু পিছপা হননি। যত দিন বেঁচে আছেন বন্য প্রাণীর জন্য কাজ করে যাবেন। তাঁর আশা, হনুমানদের জন্য যদি একটি অভয়ারণ্য করা যায় খুব ভালো হতো।

বয়স বা সামাজিক চাপের কারণে বিয়ে করার কোনো মানে নেই : সাফা কবির

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০