
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলনগরী হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ২ হাজার ৯১৭ একর ৫৫ শতক জমি রয়েছে। এসব জমির ওপর নির্মিত ৮৫০টিরও বেশি স্টাফ কোয়ার্টারের মধ্যে প্রায় ৪৫০টি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১০০টি কোয়ার্টার জরাজীর্ণ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৈধভাবে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৩০০টি কোয়ার্টার।
স্টোরপাড়া, ড্রাইভারপাড়া, রামকৃষ্ণ মোড়, বাবুপাড়া, শিশুপার্ক ও সাহেবপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু কোয়ার্টারে এখন আর রেলকর্মীরা বসবাস করেন না। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন অবৈধ দখলদাররা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিত্যক্ত ভবনগুলো আগাছায় ঢেকে থাকায় সেখানে মাদকসেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকানপাট, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শিপন আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা কোয়ার্টারগুলো থেকে সরকার কোনো ভাড়া পাচ্ছে না। ফলে সম্ভাব্য বিপুল রাজস্ব আয় থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে।
লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ এস এম আশরাফুজ্জামান তালুকদার বলেন, রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি অব্যবহৃত থাকায় পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শহরের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক আফিরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের অব্যবহৃত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, সরকারি রাজস্ব আয় এবং আধুনিক নগর উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯০০ সালে পূর্ণাঙ্গ রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ১৯৩০ সালের মধ্যে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশই বর্তমান পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আবু সাঈদ মাহমুদ ও বিএনপি কলোনির বাসিন্দা প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলো অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি বরাদ্দ পাওয়া কিছু কোয়ার্টার নিয়মবহির্ভূতভাবে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী অব্যবহৃত রেলওয়ের জমি লিজ দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিদ্যমান দখলকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মো. তসলিম আহমেদ খান বলেন, রেলওয়ের জমি ও আবাসিক ভবন দখলমুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জরাজীর্ণ কোয়ার্টার সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পরিকল্পনার আওতায় অব্যবহৃত জমিকে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবৈধ দখলমুক্ত করে পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলোর সংস্কার এবং রেলওয়ের অব্যবহৃত জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধপ্রবণতা কমবে, জননিরাপত্তা জোরদার হবে এবং লালমনিরহাটের সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
আপনার মতামত লিখুন :