শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য নিউজিল্যান্ড: মিথ এবং বাস্তবতা


এস. এম. আকরামুল কবির প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০২৬, ৭:৩৭ অপরাহ্ণ
শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য নিউজিল্যান্ড: মিথ এবং বাস্তবতা

নিউজিল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর দেশগুলোর মধ্যে একটি। এটি বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ: খাঁজকাটা পর্বত, ঢেউ খেলানো সবুজ ভূমি, খাড়া ফিয়র্ড, স্বচ্ছ ট্রাউট-ভরা হ্রদ, বয়ে চলা নদী, মনোরম সমুদ্র সৈকত এবং সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এলাকা।

এই দ্বীপগুলো একটি অনন্য জীববৈচিত্র্য অঞ্চল, যেখানে অদ্ভুত সব উড়তে না-জানা পাখির দেখা মেলে, যেমন কাকাপো এবং কিউই। নিউজিল্যান্ডবাসীরা কিউই পাখিটিকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে, এমনকি নিজেদেরও কিউই বলে পরিচয় দেয়।

সম্ভবত এইসব কারণে সম্প্রতি প্রথম আলোর একটা প্রতিবেদনে দেখলাম বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় দ্রুত উঠে আসছে নিউজিল্যান্ড। দেশটি এখন বিশ্বের শীর্ষ তিনটি জনপ্রিয় দেশের একটি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ২২ শতাংশ নিউজিল্যান্ডকে তাদের শীর্ষ পছন্দের দেশগুলোর মধ্যে রেখেছেন।

কিন্তু প্রদীপের নিচে যেমনি থাকে অন্ধকার, তেমনি বর্তমানে এখানকার সার্বিক বাস্তবতা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। নিত্যপণ্যের চড়া দাম ও জীবনযাত্রার উচ্চ খরচের কারণে নিউজিল্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন দেশটির লাখো বাসিন্দা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাসিন্দা হচ্ছে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যারা পড়াশুনা শেষ করে চাকরির কারণে অস্ট্রেলিয়া গমন করেছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের তুলনায় অস্ট্রেলিয়া শিক্ষার্থীদের বেশি পছন্দের তালিকাতে থাকলেও, ঐখানেও বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য অবশ্য আমরাই দায়ী। কয়েক মাসে আগে অস্ট্রেলিয়া স্টুডেন্টস ভিসার ক্ষেত্রে আমাদের Level-1 থেকে Level -3 তে নামিয়ে দিয়েছে। এর পুরো দায় দেশে এবং বিদেশে আমাদের কিছু Agency যারা নকল কাগজপত্র দিয়ে বা ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির মাধ্যমে আবেদন করেছিল।

নিউজিল্যান্ডেও একই অবস্থা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে । কারণ এইখানেও Aucklandসহ পুরো নিউজিল্যান্ডে ভুঁইফোড় কিছু অনলাইন এজেন্সিস নানা রকম flashy reels বানিয়ে বানিয়ে এখানকার বাস্তবিক অবস্থা বস্তুনিষ্টভাবে প্রচার না করে স্টুডেন্টসদের আকৃষ্ট করে নিয়ে আসছে। বলা হচ্ছে, স্টুডেন্টসদের ২৫ ঘন্টা কাজের কোনো অভাব নেই। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এইসব এডমিশন এজেন্সীর যারা স্নাতক বা স্নাকোত্তর পর্যায়ে স্টুডেন্টস এডমিশন করিয়ে দিচ্ছে বা দিবে বলছে, এমনকি পারলে PhD লেভেলও, তাঁরা নিজেরাই নিউজিল্যান্ডে এ ঠিকভাবে এই লেভেলের কোনো ডিগ্রী অর্জন করতে পারেনি!! বরং এদের অনেকেই নিউজিল্যান্ডের ইমিগ্রেশন পলিসির উদারতার কারণে কোভিড ১৯ এর সময় এখানে স্থায়ী হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা এখানে একেবারেই ভিন্ন!! কারণ Economic অবস্থার জন্য নিউজিল্যান্ড বর্তমানে ব্যাপক job-cuts এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । তাই শিক্ষার্থীরা আসার পর কাজ না পেলে এজেন্সিগুলো বলছে, নিউজিল্যান্ডের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই তাই কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর লাইসেন্স হয়ে গেলে দেখা যাচ্ছে ভিসার মেয়াদ এক বছরও নেই। তখন বলা হয় ভিসার মেয়াদ মিনিমাম একবছর না থাকলে জব পাওয়া কঠিন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সকল শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার উচ্চ খরচ (‘increase of living costs‘)

তাছাড়া আরো উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, Post-Study ওয়ার্ক ভিসার (PSW) মাধ্যমে Pathway to Residency হওয়ার টোপ। এই ভিসা ক্যাটেগরিতে ১-২ বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি করার পর বর্তমানে ৩ বছরের ওয়ার্ক পার্মিট দিচ্ছে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে, মাস্টার্স কোর্সগুলোতে আবেদনের ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়া বর্তমানে কিছুটা শিথিল হওয়াতে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী visa পাচ্ছে এবং বিশাল ঝুঁকি নিয়ে চলে আসছে নিউজিল্যান্ডে। কিন্তু উদ্বেগের হচ্ছে, যাঁরা এখন আসছেন ওনাদের বেশিভাগকেই আবারো বাংলাদেশে রেসিডেন্সি ভিসা না পেয়েই ফিরে যেতে হতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ, Residency লিস্টে ICT & Tech-related জবস উপরে দিকে আছে। এখন নিউজিল্যান্ডের ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালে মোটা দাগে গড়পড়তা ৬০০-৭০০ মাস্টার্স গ্রাজুয়েট বের হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পুরো নিউজিল্যান্ডে ICT & Tech এর জবস যেগুলোর স্যালারি Median wage ($৩৫.০০ প্রতি ঘন্টা) এর উপর এবং যেগুলো ছাড়া Pathway to Residency ভিসা পাওয়া যাবে না এমন সংখ্যা বড়োজোর ১০০-২০০ হতে পারে। তাহলে বাকি যাঁরা থাকবেন ওনারা সাবজেক্ট-সম্পর্কিত জবস করে Residency পাওয়ার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না।

এরপর Residency ভিসার জন্য যে অপসন থাকবে সেটা হচ্ছে, অন্য যেকোনো সেক্টরে Median Wage ($৩৫.০০ প্রতি ঘন্টা) এর উপর জব অফার থাকতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ওই specific জবের জন্য একজন Non-background Candidate এর Median Wage লেভেলের অন্য Discipline এর বাকি jobs গুলো থেকে কোন একটি জব পেয়ে Pathway to Residency তে পদার্পণ করা কতটুকু সহজ হবে তা নিয়ে আমি বেশি আশাবাদী হতে পারছিনা। তাই যে কারোরই বর্তমানের ৬-পয়েন্টস স্কিম এর আশায় সেল্ফ-ফান্ডে  শিক্ষার্থী ভিসায় নিউজিল্যান্ড আসার আগে সার্বিক সবদিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তাই সবাই এইরকম অনলাইনভিত্তিক এজেন্সিগুলোর চটকদার ভিডিও-বিজ্ঞাপন থেকে সতর্ক থাকবেন এবং পরিচিত সবাইকে সতর্ক থাকতে বলবেন এবং বাস্তবিক পরিস্থিতির সুবিধা এবং অসুবিধা সম্পর্কে সমক্ষ ধারণা নিয়ে সেলফ-ফান্ডেড শিক্ষার্থী ভিসায় নিউজিল্যান্ডের মতো প্রাকৃতিক স্বর্গে আসার আমন্ত্রণ রইলো।

লাখোকণ্ঠের খবর পেতে ফেসবুক পেজ ফলো করুন

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০