
গোল! গোল! গোল! মুহূর্তেই গর্জে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস, গ্যালারিতে সমর্থকদের উল্লাস—সব মিলিয়ে ফুটবলের এক চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরই বদলে যায় পুরো পরিবেশ। রেফারি কানে হাত দেন, খেলা থেমে যায়, আর শুরু হয় অপেক্ষা—ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর সিদ্ধান্তের জন্য। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা আসে—গোল বাতিল। মুহূর্তেই উল্লাস বদলে যায় হতাশায়, আর নতুন করে শুরু হয় বিতর্ক। প্রশ্নটা তাই আজও প্রাসঙ্গিক—ভিএআর কি সত্যিই ফুটবলকে আরও ন্যায্য করেছে, নাকি খেলার স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের মাঝেই তৈরি করেছে এক নতুন বিরতি?
ফুটবলের সৌন্দর্য শুধু গোল কিংবা জয়ে নয়; এর অনিশ্চয়তা, গতি ও আবেগই খেলাটিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করেছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে সেই আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্ভুলতার দাবি। সেই চাহিদা থেকেই ভিএআরের যাত্রা। ২০১৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এর ব্যবহার শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গভাবে এটি প্রয়োগ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—রেফারির বড় ধরনের ভুল কমানো এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোকে আরও নির্ভুল করা।
ভিএআর মূলত চারটি ক্ষেত্রে রেফারিকে সহায়তা করে—গোলের বৈধতা, পেনাল্টির সিদ্ধান্ত, সরাসরি লাল কার্ড এবং ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা। অর্থাৎ প্রতিটি ফাউলে নয়, বরং ম্যাচের ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভিএআর ফুটবলে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে বলেই মনে হয়। ভুল অফসাইড, অদেখা ফাউল কিংবা বিতর্কিত পেনাল্টির কারণে অতীতে অসংখ্য ম্যাচের ফল বদলে গেছে। ভিএআর অন্তত সেই স্পষ্ট ভুলগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছে।
তবে এখানেই বিতর্কের শুরু। ফুটবল কেবল নিয়মের খেলা নয়; এটি আবেগেরও খেলা। আগে গোল মানেই ছিল তাৎক্ষণিক উল্লাস। এখন সেই আনন্দের মাঝেও ঢুকে পড়েছে এক অনিশ্চয়তা। দর্শক, খেলোয়াড় এবং কোচ—সবার মনেই একই প্রশ্ন, ‘গোলটি কি শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে?’ অনেকের মতে, এই অপেক্ষা ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ ও আবেগকে ব্যাহত করে। প্রযুক্তি সিদ্ধান্তকে হয়তো আরও নির্ভুল করেছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক আনন্দের যে বিস্ফোরণ ফুটবলের প্রাণ, সেটি যেন কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ভিএআর কি সত্যিই সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, না। প্রযুক্তি ভিডিও দেখাতে পারে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এখনো মানুষের বিচারবোধের ওপরই নির্ভরশীল। হ্যান্ডবল ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, কোনো সংস্পর্শ পেনাল্টির জন্য যথেষ্ট ছিল কি না, কিংবা কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের খেলায় প্রভাব ফেলেছে কি না—এসব ক্ষেত্রে একই ফুটেজ দেখে ভিন্ন রেফারি ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। ফলে বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং তার রূপ বদলেছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতেও ভিএআর নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং মতভেদ থামেনি। প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, ততই বেড়েছে প্রত্যাশাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের আলোচনায় বারবার ফিরে এসেছে একই প্রশ্ন—প্রযুক্তি কি ফুটবলকে আরও ন্যায্য করছে, নাকি দর্শকদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে খেলার স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ?
আমার মতে, ভিএআরকে ফুটবলের শত্রু বলাও ঠিক নয়, আবার এটিকে সব সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তি কখনোই মানবিক বিচারবোধের বিকল্প হতে পারে না; বরং এটি হওয়া উচিত একজন রেফারির নির্ভরযোগ্য সহায়ক। ভিএআরের ব্যবহার হতে হবে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ধারাবাহিক। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে যদি ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।
ফুটবলের ইতিহাস বলে, এই খেলার সৌন্দর্য শুধু নিখুঁত সিদ্ধান্তে নয়; কখনো কখনো বিতর্কও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এটাও সত্য যে একটি স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্ত কোনো দলের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমকে মুহূর্তেই ব্যর্থ করে
দিতে পারে। তাই ফুটবলের সামনে আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি ও আবেগের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে উত্তেজনার এই সময়ে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে—আমরা কি শতভাগ নির্ভুল ফুটবল চাই, নাকি সেই ফুটবল, যেখানে মানুষের ভুল, আবেগ এবং নাটকীয়তা মিলেই খেলার সৌন্দর্য তৈরি হয়? হয়তো এর উত্তর একেবারে সাদা-কালো নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ভিএআর ফুটবলকে বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ফুটবলের প্রাণ এখনো মানুষের আবেগেই। ভিএআরের কাজ সেই আবেগকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং ন্যায্যতার মাধ্যমে তাকে আরও অর্থবহ করে তোলা। ভবিষ্যতের ফুটবলে তাই প্রযুক্তি ও মানবিকতার এই ভারসাম্যই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক : আবিদা আফরিন রিচি, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্টার্ন, অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাব (এডিএল)
আপনার মতামত লিখুন :