অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুর রহিম, অনুসন্ধানে মিলেছে সম্পদের চিত্র


এম এস শবনম শাহীন প্রকাশের সময় : ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৭ অপরাহ্ণ ৫৫
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুর রহিম, অনুসন্ধানে মিলেছে সম্পদের চিত্র

জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব থেকে নৌযান মেরামত, বয়া-বিকন সংগ্রহ থেকে ঠিকাদারি কাজ—বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রহিম। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও সূত্রের দাবি, তার প্রভাবকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ ও বিল প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অতীতেও উৎকোচ লেনদেনের অভিযোগ, দুদকের অভিযান ও সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় আলোচনায় এসেছিল তার নাম। এবার দৈনিক লাখোকণ্ঠের নিজস্ব অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের পাশাপাশি সামনে এসেছে আব্দুর রহিমের মালিকানাসংক্রান্ত একাধিক নথিও। অভিযোগ, অতীতের বিতর্ক ও নথিতে উঠে আসা তথ্য—সব মিলিয়ে আব্দুর রহিমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে বা প্রভাবে একটি বলয় দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও নৌযান মেরামত ব্যয়ের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার মতো বিষয়।

নারায়ণগঞ্জ নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকেও উদ্ধারকারী জাহাজের জ্বালানি ব্যয় নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা দপ্তর-সংশ্লিষ্ট সূত্র বয়া-বিকন, নৌযান মেরামত এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের কয়েকটি নির্দিষ্ট বিলের তথ্য তুলে ধরে সেগুলোর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

‎বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর দায়িত্বকালে আব্দুর রহিম বিভাগটিতে খুব অল্পসময়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

‎ওই কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আব্দুর রহিম নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগে নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করেন। সরকার পরিবর্তনের পরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে সেই প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে তাদের দাবি।

বর্তমানের এসব অভিযোগের আগেও বিতর্কে জড়িয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুর রহিমের নাম। গত ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে উৎকোচ লেনদেনসংক্রান্ত একটি ঘটনা সামনে আসার পর তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নজরে গিয়েছিল। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সে সময় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনাও তৈরি হয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় ওই দিন দুপুরে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরবর্তীতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (মেরিন) আব্দুর রহিম এবং উপপরিচালক ওবায়দুল করিম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জ নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট এবং বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, উদ্ধারকারী জাহাজ পরিচালনায় বছরের পর বছর জ্বালানি খরচের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তাদের দাবি, জ্বালানি ব্যয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান বা তদন্তে নামে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে অসংগতি পাওয়া যায়।

নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেখানে আগে ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ নামে দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ ছিল। বর্তমানে ‘নির্ভীক’ বরিশাল থেকে পরিচালিত হলেও ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ২৫০ টন উত্তোলনক্ষমতার ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাটসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে নোঙর করে রাখা হয়।

এই জাহাজকে ঘিরেই জ্বালানি ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, জাহাজটির প্রকৃত জ্বালানি ব্যবহারের তুলনায় ব্যয় বেশি দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এর সঙ্গে রহিমের নেতৃত্বাধীন বা প্রভাবাধীন একটি চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা দপ্তর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, বয়া-বিকন বাতিসহ নৌপথে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও অনিয়ম হয়েছে।

দপ্তর-সংশ্লিষ্ট সূত্রটির দাবি, বিগত ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত রহিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঠিকাদার বাহার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সূত্রের অভিযোগ, আব্দুর রহিমের সঙ্গে ওই ঠিকাদারের ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং বিভিন্ন নামে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দপ্তরের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

‎নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা দপ্তর-সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আখি এন্টারপ্রাইজের নামে টিপি-১৩৫ বাবদ ৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা; তানিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে এমপি-১২ বাবদ ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা; তানজিল ডক ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের নামে টিপি-৮০ বাবদ ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫২ টাকা এবং টিপি-১৭৩ বাবদ ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা; তানিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে স্পিডবোট-১ মেরামত বাবদ ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টাকা এবং আলিফ এন্টারপ্রাইজের নামে টিপি-৪৫ বাবদ ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৫১ টাকার বিল নিয়ে অনিয়মের তীব্র অভিযোগ রয়েছে।

‎তথ্য প্রদানকারী সূত্রের দাবি, এসব বিলের অন্তত কয়েকটি বাস্তবে সম্পাদিত কাজ ও প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে শুধু সূত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে এসব বিলকে ভুয়া হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ, দরপত্র, কাজ সম্পাদনের প্রত্যয়নপত্র, বিল-ভাউচার এবং অর্থ পরিশোধের নথি মিলিয়ে দেখার পরই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

উদ্ধারকারী জাহাজের জ্বালানি ব্যয়, নৌযান মেরামতের বিল, বয়া-বিকন সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুর রহিমকে ঘিরে উঠা প্রশ্নগুলো সরকারি অর্থের ব্যবহার, সরকারি ক্রয় ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

‎এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ’র এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিপুল সম্পদ অর্জন নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে। তবে পূর্বপ্রকাশিত অভিযোগের উপর নির্ভর না করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নীতি অনুসরণ করে লাখোকণ্ঠ নিজস্বভাবে তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র যাচাই করে অনুসন্ধান চালায়। সেই অনুসন্ধানেই অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুর রহিমের মালিকানাসংক্রান্ত একাধিক নথিপত্র এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

‎লাখোকণ্ঠের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাবনার চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা-১৬ মৌজার হোল্ডিং নং ১২১৪ ও খতিয়ান নং ১২১৪; ঢাকার মতিঝিল উপজেলার মান্ডা-৯ মৌজার হোল্ডিং নং ১৫৯/৩৮ ও খতিয়ান নং ৭৩৬১; একই উপজেলার রাজারবাগ-৭ মৌজার হোল্ডিং নং ৬৩/৯১ ও খতিয়ান নং ১৯৮১৩ এবং একই মৌজার হোল্ডিং ও খতিয়ান নং ২০২৬-১০০২৩৪ -এ আব্দুর রহিমের সম্পদ রয়েছে।

এগুলো কোনো মৌখিক অভিযোগ বা সূত্রনির্ভর দাবি নয়; লাখোকণ্ঠের অনুসন্ধানে পাওয়া সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতেই তার সম্পদের এই আংশিক চিত্র উঠে এসেছে।

‎তবে একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি তাঁর সম্পদের পুরো চিত্র নয়; বরং দৃশ্যমান সম্পদের একটি অংশমাত্র। নথিপত্রে পাওয়া সম্পদের বাইরেও তাঁর নামে বা বেনামে আরও কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

‎অভিযোগগুলোর বিষয়ে সার্বিক মন্তব্য জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে-বার্তার মাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়। এমনকি পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‎সব মিলিয়ে জ্বালানি ব্যয়, নৌযান মেরামত, বয়া-বিকন ও ঠিকাদারি কাজ ঘিরে ওঠা একের পর এক অভিযোগের সঙ্গে অনুসন্ধানে সামনে আসা সম্পদের নথি—আব্দুর রহিমকে ঘিরে তৈরি করেছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অতীতের দুদক অভিযান ও সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাও সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।

‎অভিযোগগুলোর নেপথ্যে প্রকৃত সত্য কী, সরকারি অর্থের ব্যবহারে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং নথিতে উঠে আসা সম্পদের অর্থের উৎস কী—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলতে পারে কেবল সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন ও সরকারি রেকর্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে। এখন দেখার বিষয়, এতসব অভিযোগ ও নথির সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো কতটা গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখে এবং শেষ পর্যন্ত কী সত্য সামনে আসে।

ই-প্রিন্ট

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২
৩৪৫৬৭৮৯
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১