ডিজিটাল বাংলাদেশ: সুবিধা বেশি না বিভ্রান্তি?


প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ
ডিজিটাল বাংলাদেশ: সুবিধা বেশি না বিভ্রান্তি?

ডিজিটাল বাংলাদেশ: সুবিধা বেশি না বিভ্রান্তি?

–  তামান্না ইসলাম 

একুশ শতকের শুরুতে বাংলাদেশের বুকে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের বীজ বপন করা হয়েছিল, তখন অনেকেই এই ধারণাকে নিছক কল্পকথা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই বীজ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক দশক আগেও যেখানে ইন্টারনেট ছিল বিলাসিতা, আজ সেখানে স্মার্টফোন আর ওয়াইফাইয়ের দৌলতে পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অভাবনীয় অগ্রগতির মাঝে একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয়—ডিজিটাল বাংলাদেশ কি আমাদের জন্য শুধুমাত্র আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, নাকি এর সুবিধাগুলো এক অদৃশ্য বিভ্রমের জালে আমাদের জড়িয়ে ফেলেছে? এই আলোচনা তাই কেবল প্রযুক্তি নিয়ে নয়, বরং এর ভালো-মন্দ প্রভাবের এক নির্মোহ বিশ্লেষণ।

ডিজিটাল বাংলাদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি হলো এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর। একসময় যেখানে কেনাকাটা মানে ছিল ভিড় ঠেলে দোকানে যাওয়া, আজ সেখানে একটি মাত্র ক্লিকের দূরত্বে সব পণ্য হাজির। ই-কমার্স শুধু মানুষের জীবনকে সহজ করেনি, বরং হাজার হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করেছে। ছোট-বড় অনেক ব্যবসাই এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে নির্ভরশীল। গ্রামের একজন কারিগর তার পণ্য সরাসরি শহরের ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন, যা আগে ছিল অকল্পনীয়। এর ফলে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

এই রূপান্তরের আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ই-লার্নিং। করোনাকালীন সময়ে যখন স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল, তখন এই ডিজিটাল মাধ্যমই শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রেখেছিল। অনলাইন ক্লাস, ভিডিও টিউটোরিয়াল, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোর্স এখন সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও এখন ঘরে বসে বিশ্বের সেরা শিক্ষকদের লেকচার শোনার সুযোগ পাচ্ছে। এটি কেবল শিক্ষার পদ্ধতিকে পরিবর্তন করেনি, বরং জ্ঞানকে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক সুযোগ পেলে প্রযুক্তি কীভাবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ—তার তরুণ প্রজন্মকে শক্তিশালী করতে পারে।

এছাড়া, ডিজিটাল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (ডিজিটাল আর্থিক সেবা) আমাদের লেনদেনের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। এখন মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে খুব সহজে টাকা পাঠানো বা বিল পরিশোধ করা যায়। এতে একদিকে যেমন সময় বেঁচেছে, তেমনি কমেছে নগদ অর্থের ঝুঁকি। সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট আবেদন থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন ফরম পূরণ—সবকিছুই এখন অনলাইনে করা সম্ভব। এটি সরকারি কার্যালয়ে ঘোরাঘুরি ও দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়েছে, এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের এই জয়যাত্রার পাশাপাশি এর কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন অগণিত, তেমনি এর অপব্যবহারও কম নয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। যে সামাজিক মাধ্যমগুলো মানুষকে সংযুক্ত করার কথা ছিল, সেগুলোই এখন একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় ব্যয় করছে। লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের নেশায় তরুণ প্রজন্ম তাদের সৃজনশীলতা ও মননশীলতা হারাচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের মধ্যে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই আসক্তি আরও একটি বড় সমস্যার জন্ম দিয়েছে—তা হলো ফেক নিউজ বা মিথ্যা সংবাদ। একটি ভুল খবর মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, আর যাচাই-বাছাইয়ের আগেই তা সমাজে বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করে। কোনো গুজবকে মিথ্যা প্রমাণ করা যতটা কঠিন, তার চেয়ে শতগুণ দ্রুত গতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে। এই মিথ্যা সংবাদগুলো কখনও কখনও সাম্প্রদায়িক উস্কানি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। ডিজিটাল যুগে কে সত্যি বলছে আর কে মিথ্যা, তা বোঝা এখন এক দুরূহ কাজ। তথ্যের মহাসাগরে আমরা দিকনির্দেশনাহীন এক নাবিকের মতো হয়ে পড়েছি।

এছাড়া, সাইবার অপরাধ, অনলাইন বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাহীনতাও এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এখন প্রায়ই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক জালিয়াতি আমাদের ডিজিটাল জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে আমরা ই-কমার্সে কেনাকাটা করছি, অন্যদিকে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ভয়ে শঙ্কিত হচ্ছি।

তাহলে এই সব সুবিধা আর সমস্যার মাঝে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রাপথ কি শুধুই কাঁটা বিছানো? এই প্রশ্নের উত্তর হলো: না। প্রযুক্তি একটি নিরপেক্ষ হাতিয়ার। তার ভালো বা খারাপ ব্যবহার নির্ভর করে ব্যবহারকারীর ওপর। কম্পিউটার যেমন আমাদের কাজ সহজ করে দেয়, তেমনি এর অপব্যবহার করে সাইবার অপরাধও করা যায়। ঠিক তেমনই, ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে আমাদের সবার আগে প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করা জানলেই হবে না, বরং ইন্টারনেটের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। কীভাবে ফেক নিউজ চিনতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয়, এবং কীভাবে সুস্থ ও উৎপাদনশীল উপায়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়—এই জ্ঞানগুলো অর্জন করা জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত সবারই এই দায়িত্ব রয়েছে।

সরকারের দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তি সরবরাহ করা নয়, বরং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নীতি ও বিধি প্রণয়ন করা। সাইবার নিরাপত্তা আইনকে আরও শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। একই সাথে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সুফল যেন সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সমাজের একটি বড় অংশ এখনো এই সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে, যা তথাকথিত ডিজিটাল ডিভাইড (ডিজিটাল বৈষম্য) তৈরি করছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের এই পথচলা এক জটিল ও বহুমুখী প্রক্রিয়া। এটি কোনো সরল সমীকরণ নয় যেখানে কেবল সুবিধা বা কেবল বিভ্রান্তি রয়েছে। বরং এটি একটি দ্বিখণ্ডিত বাস্তবতা। একদিকে প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে এর অপব্যবহারের কালো ছায়া। এই যাত্রাপথের সফলতা নির্ভর করবে আমরা কীভাবে এই দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করি তার উপর। আমরা কি শুধুমাত্র প্রযুক্তির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেব, নাকি সচেতনভাবে সেই স্রোতকে নিজেদের কল্যাণে প্রবাহিত করব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

 

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ।

আর্কাইভ